ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে ব্যাপক প্রশাসনিক অভিযানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি বনভূমি অবৈধ দখলমুক্ত করা হয়েছে। বিজেপিদলীয় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকারের এই পদক্ষেপে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৫০০-এরও বেশি পরিবার, যাদের বড় অংশই বাঙালি মুসলিম। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত এই প্রক্রিয়াকে রাজ্যের রূপান্তরের ‘রুদ্র রূপ’ হিসেবে বর্ণনা করলেও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের জোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। কারণ, যাঁদের উচ্ছেদ করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম।
রাজ্য প্রশাসনের দেওয়া তথ্যানুসারে, নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট—এই তিন জেলায় এক সপ্তাহের বিশেষ অভিযানে ৬৩৮ হেক্টরের বেশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল উদ্ধার করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল বনাঞ্চলের সুরক্ষিত জমি রক্ষা করা ও সেখানে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ধ্বংস করা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযানটি পরিচালিত হয় নগাঁও জেলার লুতুমাই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে, যেখানে এক দিনেই প্রায় ৩১৪ হেক্টর জমি ফাঁকা করা হয়। বন বিভাগের এই পদক্ষেপে এক দিনে প্রায় ৫৫০টি পরিবার চরম ক্ষতির মুখে পড়ে, যদিও তিন জেলা মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি।
উচ্ছেদ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বন কর্মকর্তারা জানান, পুরো প্রক্রিয়া আদালতের আইনি নির্দেশ মেনেই সম্পন্ন করা হয়েছে। কোনো বলপ্রয়োগের আগে গত আগস্ট মাসেই মাইকিং করে স্থানীয়দের এলাকা ছাড়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে অভিযানের আগেই প্রায় ৯০ শতাংশ অধিবাসী নিজেদের উদ্যোগে এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে দাবি করে প্রশাসন। এরই ফলে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর আগেই প্রায় ৯০ শতাংশ কথিত দখলদার স্বতঃস্ফূর্তভাবে জায়গা খালি করে চলে যান।
তবে উচ্ছেদের কৌশল ও উদ্দেশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ভিন্ন দাবি উঠে এসেছে। অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন নামে একটি সংগঠন অভিযোগ করেছে, রবিবারের অভিযানে সহস্রাধিক ঘরবাড়ি উচ্ছেদের পাশাপাশি একাধিক মসজিদও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি জানান, লুতুমাই বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর একটি বড় অংশকে ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার সাময়িকভাবে সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। আদালতের রায় থাকলেও প্রশাসন বেছে বেছে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে বলে দাবি তাদের, অথচ অন্য ধর্মাবলম্বী অধিবাসীদের এখনো নোটিশ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সব মিলিয়ে এ উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে অঞ্চলে এক থমথমে ও স্পর্শকাতর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্টে দাবি করা হয়েছে, অভিযানে ১ হাজার ১০০-এর বেশি পরিবারকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা ছাড়াও বেশ কয়েকটি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। সব মিলিয়ে সম্পত্তি উদ্ধার ও স্থানীয় লোকজনের দাবির মধ্যে এক মিশ্র ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকেও এই অভিযান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। ওই সংগঠনের দাবি, আদালত নির্দেশ দিলেও উচ্ছেদপ্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট এক সম্প্রদায়ের মানুষকে নিশানা করা হচ্ছে।

