টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বর্তমানে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা ইস্যুতে ভারতের ‘জেন-জি’ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। এই প্রতিবাদী তরুণদের আন্দোলনের সামনের সারিতে উঠে এসেছেন ২৯ বছর বয়সী বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। বর্তমানে তিনি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক বিদ্রোহ ছিল সেই আন্দোলনের অনুপ্রেরণা।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গত ১২ অক্টোবর প্রধান বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশ্যে এক বিশাল পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে আইনি আবেদন জমা দিতে যাওয়ার পথে তার সঙ্গে ছিলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং নেহা বোরা। এই ঘটনাটি মোদি সরকারের ওপর তরুণদের ক্রমবর্ধমান চাপের একটি বড় বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটার তালিকার বিতর্কিত সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও সরব হয়েছেন এই তরুণরা। নেহা বোরা দেখতে ছিপছিপে গড়নের, চুল কালো এবং কণ্ঠস্বর বেশ গম্ভীর ও বলিষ্ঠ। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পুলিশ ধাওয়া করে নেহাকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় এবং কয়েক ঘণ্টা পর তাঁকে ছেড়ে দেয়।
নেহা বোরার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) থেকে। দীর্ঘ এক দশক ধরে শিল্পকলা নিয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি বর্তমানে তিনি সেখানে নাট্যকলায় পোস্টডক্টরাল পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন। ২০১৯ সালে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হয়। এরপর থেকে জেএনইউয়ের প্রতিটি কক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করা ও প্রচারপত্র বিলি করার মাধ্যমে তিনি আইসার সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেন। দলটির উত্থান ঘটে ১৯৬৭ সালে পূর্ব ভারতে শুরু হওয়া মাওবাদী নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিদ্রোহের ধারায়।
আন্দোলনের কৌশল হিসেবে নেহা ও তার দল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিপ্লবী ভগত সিংয়ের প্রতিরোধ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। আইসার জ্যেষ্ঠ নেতা ও নেহার পরামর্শক এন সাই বালাজি মনে করেন, সাধারণ মানুষ যখন সরকারি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও হতাশা থেকে মুক্তি খুঁজছে, তখন নেহার মতো নিঃস্বার্থ আন্দোলনকারীরা তাদের কাছে আশার আলো হয়ে দেখা দিচ্ছেন। এ কারণে সরকারের তরফ থেকে তাদের ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া হলেও জনগণের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা কমেনি। অনেক ছাত্রনেতাকে নিজ নিজ বাড়িতে নজরবন্দী করা হয়।
চলতি বছরের শুরুর দিকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নেহা ও তার সহকর্মীরা যন্তর মন্তরে টানা কয়েক সপ্তাহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সে সময় এক অনশন কর্মসূচিতে নেহার মায়ের উপস্থিতির ঘটনা তাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি দেয়। নেহা উত্তরাখণ্ডের খাতিমা শহরের এক সামরিক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যার ফলে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বেশ দূরত্ব তৈরি হয়। তার বাবা-মা বিজেপির সমর্থক হওয়ায় এই মতবিরোধ এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে আসে। নেহার রাজপথের রাজনীতি বুঝতে হলে আগে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
মোদি সরকারের কঠোর নজরদারি ও পুলিশের বাধা সত্ত্বেও নেহা নিয়মিত রাজপথে সরব থাকেন। গত ১০ অক্টোবর মোদি সরকার যখন নয়াদিল্লি অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, তখন নেহা ইনস্টাগ্রাম লাইভে এসে সমর্থকদের উজ্জীবিত করেন এবং পুলিশের চোখ এড়িয়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তার এই সাহসিকতা ও জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ হয়ে সফটওয়্যার ডেভেলপাররা তাকে নিয়ে সুপার মারিও ধাঁচের একটি ভিডিও গেম তৈরি করেছেন, যেখানে নেহা পুলিশের ব্যারিকেড এড়িয়ে ‘গণতন্ত্র পয়েন্ট’ সংগ্রহ করেন।
তরুণদের মধ্যে নেহার জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে যে, দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথসহ অনেকেই তাকে ‘গণতন্ত্রের দেবী’ বলে অভিহিত করেছেন। নিশিতা তার তুলনা করেন হংকংয়ের আন্দোলনকারী নেত্রী অ্যাগনেস চাউয়ের সঙ্গে। যদিও নেহা নিজে এই ধরনের উপমায় আগ্রহী নন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলীর মতে, আইসার মতো ছাত্রসংগঠনের জন্য নির্বাচনী রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়া কঠিন। তিনি মনে করেন, নেহার মতো তরুণদের মূলধারার জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার মাধ্যমেই সংসদীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু নেহা আন্দোলনকারীদের ধরতে আসা নিরাপত্তা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার এক কৌশল রপ্ত করেছেন। দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ চলতি মাসের শুরুর দিকে সেন্ট্রাল দিল্লিতে বসে বলেন, ‘আমরা কি নেহাকে “গণতন্ত্রের দেবী” বলতে পারি। বেইজিংয়ের চাপিয়ে দেওয়া যেসব আইনকে সমালোচকেরা কঠোর ও দমনমূলক বলে অভিহিত করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে অ্যাগনেস এই উপাধি পেয়েছিলেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে জেএনইউর রাজনীতিতে বড় প্রভাব ধরে রেখেছে সংগঠনটি। নেহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আইসার ২৫ বছর বয়সী ছাত্রনেতা দানিশ আলী বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে আমাদের দল দীর্ঘদিন গোপনে পরিচালিত হতো।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রকৃত উত্তরসূরিদের অস্বীকার করার জন্যই বিজেপি বামপন্থীদের ভয় পায় বলে নেহা মনে করেন। গত আগস্ট মাসে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি যখন ‘আরবান নকশাল’ বা ‘বুদ্ধিজীবী নকশালদের’ বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন, তখন নেহা একে বামপন্থীদের প্রতি ভয়েরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। দীর্ঘ সময় গোপনে কাজ করা আইসা ১৯৯০-এর দশকে সংসদীয় ধারায় এলেও তাদের মূল চেতনা এখনো বিপ্লবী প্রতিরোধ ও গেরিলা কৌশলের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৯০ সালের আগস্টে গঠিত হয় আইসা। রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের মুখে দলটি অন্তত তিন দশক গোপনে কাজ করেছে। ১৯৯০–এর দশকে তারা সশস্ত্র পথ ত্যাগ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় যুক্ত হয়, যদিও তাদের কিছু ভাঙনধারা এখনো সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পক্ষপাতী।
ব্যক্তিগত জীবনে নেহা একজন গায়িকা এবং ডাফলি বাজাতেও পারদর্শী। তার ব্যক্তিত্ব, কথা বলার ভঙ্গি এবং রাজনৈতিক অবস্থান তরুণদের মধ্যে তাকে ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সরকার বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনের সময় নেহার ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হতে থাকে, যা মোদি সরকারের জন্য এক নতুন ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বামপন্থী রাজনীতির চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে নেহা বর্তমানে ভারতের নতুন প্রজন্মের কাছে প্রতিরোধের এক আধুনিক প্রতীক হয়ে উঠছেন। কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর পেরিয়ে তিনি এখন ভারতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ সময় পদযাত্রায় সামনে থাকা দুই নারীর কাঁধে তিনি হাত রেখেছিলেন। বিশ্বজুড়ে জেন–জি প্রজন্মের প্রতিবাদের প্রতীক অ্যানিমে ‘ওয়ান পিস’–এর টি–শার্ট পরে তিনি দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকায় উপস্থিত হন।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মতো দলগুলো রাজপথে অবস্থান ধর্মঘট করার সময় পুলিশের হাতে দ্রুত আটক হলেও, নেহা নিজের বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলে পুলিশের নজর এড়িয়ে রাজপথের রাজনীতিকে বেগবান রেখেছেন। তার এই কৌশলী পদক্ষেপ এবং তরুণদের সংগঠিত করার দক্ষতা ভারতের আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ নানা সফলতায় আইসার সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ মিলেছে, যা আগামী দিনগুলোতে মোদি সরকারের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জের বার্তা দিচ্ছে। এমনকি উড়োজাহাজে রাজধানীতে পৌঁছামাত্র ককরোচ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের উড়োজাহাজ থেকেই আটক করে পুলিশ।
নেহা বোরা বর্তমানে ভারতের রাজনীতিতে এমন এক নতুন জায়গা তৈরি করছেন, যা কেবল বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। মার্ক্সবাদকে কেবল তত্ত্ব হিসেবে নয়, বরং আধুনিক যুগের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে নেহা নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন। পুলিশের কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক চাপের মুখেও তার পিছু না হটার মানসিকতা তাকে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক আলোচিত নাম করে তুলেছে। তবে রাজনৈতিক নেতাকে দেবতার আসন থেকে নামিয়ে আনার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও নিজের সঙ্গে এমন তুলনা চান না নেহা বোরা।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনের পর তরুণ প্রজন্মের পক্ষ থেকে আসা এই জোরালো চ্যালেঞ্জ কেবল নেহা বোরার নেতৃত্বে সীমিত নয়, এটি ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করছে। আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণদের অধিকার আদায় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার লড়াইয়ে নেহা বোরা এখন এক অনিবার্য নাম হয়ে দাঁড়িয়েছেন, যার দিকে তাকিয়ে আছে ভারত ও তার উত্তপ্ত রাজপথ। এটি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন।

