টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার সুইটি আক্তারের পরিবার এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে, সৌদি আরবে তাদের মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে শোকে পাথর হয়ে আছে পুরো পরিবার। মা জহুরা বেগম বারবার মেয়ের লাশের অপেক্ষায় আহাজারি করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পরিবারের অভাব দূর করার স্বপ্ন নিয়ে তিন বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন সুইটি। সেখানে তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন, কিন্তু যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় সুইটি আক্তারের। এরপর পরিবারের চাপে আরেকজনকে বিয়ে করেন।
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে গত ১৪ অক্টোবর (বুধবার) নিশ্চিত করেছে যে, মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের দায়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সুইটি আক্তার ছাড়াও নজরুল ইসলাম নামের আরেকজন ছিলেন। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের মো. ফজল মিয়া ও জহুরা বেগমের পাঁচ মেয়ের মধ্যে সুইটি ছিলেন সবার ছোট। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে বিদেশে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ভাগ্য সহায় হয়নি তার। সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য হতাশার: হুমায়ুন কবির। ওর (সুইটি) যে এই অবস্থা অইবো, জানলে কি আর বিদেশে যাইবার দিতাম।’।
সুইটির বাবা ফজল মিয়া জানান, ২০২৩ সালের মার্চে একটি এজেন্সির মাধ্যমে তার মেয়ে সৌদি আরবে যায়। সুইটির মা–বাবা তখন ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন।
প্রথম দিকে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও ছয় মাস পর হঠাৎ মেয়ে ফোন করে জানায়, তার সাথে কাজ করা বান্ধবীরা অবৈধভাবে একটি গাড়ি কিনেছিল, যার দায়ে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কারাগারে থাকা অবস্থায় মাঝেমধ্যে মেয়ের সাথে কথা হতো, তবে গত এক বছর ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর (মঙ্গলবার) মাগরিবের নামাজের পর সুইটির সাথে তার বাবার শেষ কথা হয়। তখনও সে বিচার বা দণ্ডের বিষয়ে কিছুই জানায়নি। কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কোনোরকমে নিজেকে সামলে বললেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। পরে বলেন, ‘আমার চাচায় মাটি কাইট্যা ভাত খায়। একপর্যায়ে বললেন, ‘মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না…আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও।
পরিবারের স্বজন ও প্রতিবেশীদের দাবি, সুইটি ষড়যন্ত্রের শিকার। তার চাচাতো বোন সালমা আক্তার জানান, সুইটির সংসার জীবনের শুরু থেকেই ছিল টানাপোড়েন। দ্বিতীয় বিয়ের পর স্বামীকে সৌদি পাঠাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তারা, পরে সেই ঋণ শোধ করতে নিজেই বিদেশে যান সুইটি। বাড়িতে তার নয় বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে, যে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে সুইটি যে এমন পরিণতির শিকার হবেন, তা কল্পনাও করতে পারেননি স্বজনরা। তাঁদের কেউ সুইটির স্বজন, কেউবা প্রতিবেশী। তাঁর মেয়ে (৯) স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
এই ঘটনায় মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম জানিয়েছেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি তারা অবগত আছেন। শোকার্ত মা জহুরা বেগম বারবারই অনুরোধ করছেন, যেন যেকোনো উপায়ে তার মেয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি বলেন, তার মেয়ে কোনো অন্যায় করতে পারে না। এখন শুধু শেষবার মেয়ের মুখটি দেখতে চান তিনি। কোনো কারণে ফোন দিতে না পারলেও দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন তিনি।
উল্লেখ্য যে, এই মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাটি নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি পুরোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে সুইটির পরিবার এখন কেবল শোক ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের একমাত্র চাওয়া, দ্রুত যেন মেয়ের মরদেহটি পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং এই অভিযোগের প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয়।

