মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি উইলিসকে সরিয়ে নতুন হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারকে। গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প নিজেই এই পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। আগামী সোমবার থেকে ৪১ বছর বয়সী মিলার আনুষ্ঠানিকভাবে সুসি উইলিসের স্থলাভিষিক্ত হবেন। ট্রাম্প তাঁর এই নতুন চিফ অব স্টাফকে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত উপদেষ্টাদের একজন হিসেবে অভিহিত করেছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। সংশোধিত নীতির পক্ষে শেষ পর্যন্ত রায় দেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট।
মিলার শুরু থেকেই ট্রাম্পের বিতর্কিত বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নেপথ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকানদের জন্য সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও ট্রাম্প তাঁর পূর্বের কট্টর অবস্থানেই অটল রয়েছেন, যার স্পষ্ট প্রতিফলন এই নতুন নিয়োগ। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর নীতির বিরুদ্ধে সরব হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে তারা ট্রাম্প প্রশাসনে মিলার ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করতে পারবে।
নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই স্টিফেন মিলার রক্ষণশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকা হাইস্কুলে পড়ার সময় তিনি নিয়মিত স্থানীয় বেতার অনুষ্ঠানে উদারপন্থী নীতির সমালোচনা করতেন। এ সময় তিনি ওই আইনপ্রণেতা ও অন্য ডেমোক্র্যাটদের ‘গভীরভাবে ইহুদিবিদ্বেষী ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’ বলেও আখ্যা দেন।
পরবর্তীতে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রক্ষণশীল ছাত্রসংগঠন ‘ডিউক কনজারভেটিভ ইউনিয়ন’-এর নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত তিন শিক্ষার্থীর পক্ষে সরব অবস্থান নিয়ে তিনি আলোচনায় আসেন।
পড়াশোনা শেষ করে ওয়াশিংটন ডিসিতে রিপাবলিকান সিনেটর জেফ সেশনসের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হয়ে মিলার ট্রাম্পের বক্তব্যের ধরণ ও রাজনৈতিক কৌশলী ভাষা তৈরিতে মূল ভূমিকা রাখেন। ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, রাজনৈতিক বার্তা সাজানোর ক্ষেত্রে মিলার ও ট্রাম্পের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া ছিল। হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা ও ভাষণ লেখক হিসেবে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতিগুলোকে ‘পশ্চিমা সভ্যতা’ রক্ষার কৌশল হিসেবে তিনি প্রচার করেছিলেন। ট্রাম্পকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য সাজাতে সহায়তা করেছিলেন মিলার।’।
২০১৯ সালে ‘সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টার’ কিছু ই-মেইল ফাঁস করলে মিলারের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা সে সময় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। ২০১৮ সালে সীমান্তে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রবর্তনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল, যার ফলে অনেক শিশু তাদের বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হয়। পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ট্রাম্প প্রশাসন সেই নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিল। সেসব ই–মেইলে মিলারের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ওয়েবসাইট ও মতাদর্শকে সমর্থন করার তথ্য পাওয়া যায়। ২০২০ সালে কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন জেনেশুনে একজন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিনির্ধারণী ও প্রভাবশালী পদে বসিয়েছে। ২০২১ সালে কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের মুখে পরে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নীতিটি পরিবর্তন করেন ট্রাম্প। তাঁরা ক্রমেই এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ নেই অথবা যাঁরা সামান্য অপরাধে অভিযুক্ত।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশ করা শিশুদের সুরক্ষা কর্মসূচি ‘ডেকা’ (DACA) বন্ধ এবং ২০১৭ সালে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের পেছনেও মিলারের প্রধান ভূমিকা ছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত এসব কঠোর বিধিনিষেধের অন্যতম রূপকার হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়কে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের ভিত্তিহীন জালিয়াতির দাবির পক্ষেও তিনি জোরালো অবস্থান নেন। বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়নের অন্যতম রূপকার হিসেবে দেখা হয় তাঁকে। বিচার বিভাগের এ নীতির আওতায় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গ্রেপ্তার হওয়া মা-বাবার সঙ্গে তাঁদের শিশুদের রাখার নিয়ম নেই। অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা শিশুদের জন্য চালু করা ‘ডেফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস’ কর্মসূচি বন্ধের পক্ষেও প্রচার চালান মিলার। এ কর্মসূচির আওতায় ওই শিশুগুলো বড় হয়ে শিক্ষা ও চাকরির বৈধ কাগজপত্র পেত। প্রাথমিক আদেশে সিরিয়া, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকদের ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। এ অভিযানের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থনকারী এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকারের নিপীড়নের সমালোচনাকারী ভিসাধারী ও স্থায়ী বাসিন্দাদেরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মিলার ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রশাসনের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ফর পলিসি ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অভিবাসী বহিষ্কার অভিযান পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। এই অভিযানের মাধ্যমে প্রতিদিন অন্তত ৩০০০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন বলে তিনি গত বছরের মে মাসে ফক্স নিউজকে জানিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প যখন আবার রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, তখনো তাঁর পাশে ছিলেন মিলার।
মিলার অভিবাসন সংস্থাগুলোর আগ্রাসী কৌশলের পক্ষেও সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে এক অভিযানে রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হওয়ার পর তিনি তাঁদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে মন্তব্য করে বিতর্কের জন্ম দেন। এছাড়া তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও গাজায় চলমান সংকটের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিবকে ফিলিস্তিনপন্থী বক্তব্যের জন্য সংসদ থেকে বহিষ্কারের দাবিও তুলেছিলেন তিনি। এ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসন কর্মকর্তাদের তৎপরতা বেড়েছে। রাশিদা তালিব কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নারী। ২০২৩ সালে ফক্স নিউজকে মিলার বলেছিলেন, ‘রাশিদা তালিবকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা উচিত।
হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালনকালে তিনি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার বাতিলের মতো চরমপন্থী উদ্যোগের পক্ষেও কথা বলেছেন। একই সঙ্গে ভূ-রাজনীতিতে আগ্রাসী পদক্ষেপের সমর্থক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মিলার ভেনেজুয়েলার নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সামরিক অভিযানের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড দখলের অধিকার আছে বলে মন্তব্য করেছেন। তবে চিফ অব স্টাফ হিসেবে তাঁর বর্তমান ভূমিকা প্রশাসনিক তথ্যপ্রবাহ ও নীতি নির্ধারণে ট্রাম্পের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো পর্যবেক্ষণের বিষয়।

