ইসরাইলের সরকার গঠনের দায়িত্ব কার হাতে ন্যস্ত করা হবে, সে বিষয়ে আগামী রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেবেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে টানা দুই দিন আলোচনা শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বৃহস্পতিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেন হারজগ।
নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোট—কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সক্ষম হননি। নেতানিয়াহু ডানপন্থি রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত।
প্রেসিডেন্টের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও, প্রথা অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের সমর্থন যার বেশি থাকে, সরকার গঠনের দায়িত্ব তাকেই দেওয়া হয়। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এবারের পার্লামেন্টে আইজেনকোটকে সমর্থন দিয়েছেন ৬৭ জন এমপি, আর নেতানিয়াহুর পক্ষে রয়েছেন ৪৬ জন। অবশিষ্ট সাতজন কোনো পক্ষকেই সমর্থন করেননি। ফলে রাষ্ট্রের ওপর তাদের আর্থিক ও সামাজিক চাপও বেশি।
হারজগ জানান, আলোচনার ফলাফল আপাতদৃষ্টিতে স্পষ্ট মনে হলেও আইনি জটিলতা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী, কার সরকার গঠনের সক্ষমতা রয়েছে তা নির্ধারণের ভার আমার ওপর। দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ ও মতপার্থক্যের কারণে বিষয়টি এখনো পুরোপুরি মীমাংসা হয়নি। দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন দলের নেতার সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলব।’
আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ‘ইয়াশার’ দল এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইসরাইলের জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে ম্যান্ডেট দিয়েছে।
দলটি দ্রুত একটি জাতীয় জরুরি সরকার গঠনের ওপর জোর দিচ্ছে।
অন্যদিকে, আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলো এবার ১৯টি আসন পেয়ে ইতিহাস গড়েছে। আইজেনকোটকে সরকার গঠনে এই দলগুলো সমর্থন দিলেও, তার জোটের অন্যতম শরিক দল ‘ইসরাইল বেইতেনু’ আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারে থাকতে রাজি নয়। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি সরকারের প্রতি ক্ষোভ এবং আরব ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও বৈষম্যমূলক আচরণের দীর্ঘদিনের অভিযোগের কারণে এবারের নির্বাচনে আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।
দলটির নেতা আভিগদর লিবারম্যানের অভিযোগ, আরব দলগুলো হামাসকে স্পষ্ট ভাষায় সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেনি। যদিও দলগুলোর পক্ষ থেকে একাধিকবার হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। এদিকে, অতি-ধর্মীয় দল ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ উভয় নেতার দিক থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সাত আসন পাওয়া দলটি জানিয়েছে, তারা কাউকে সরকার গঠনের জন্য প্রেসিডেন্টকে সুপারিশ করবে না। দলটির নেতা আভিগদর লিবারম্যান একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। যদিও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার নিন্দা একাধিকবার জানিয়েছে দলগুলো।
ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি প্রদান নিয়ে দেশজুড়ে প্রবল অসন্তোষ বিদ্যমান। গাজা, লেবানন ও ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রিজার্ভ সেনাদের ওপর বাড়তি চাপের কারণে সাধারণ মানুষ এই অব্যাহতির অবসান চায়। তোরাহ জুডাইজম এই অব্যাহতি বহাল রাখার দাবি জানালে, আইজেনকোট তা বাতিলের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। গত তিন বছর ধরে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইসরাইলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, তোরাহ জুডাইজমের বর্তমান কৌশল নেতানিয়াহুকে চাপে রাখা। তবে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর দিকে গড়ালে তারা সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এছাড়া, নেতানিয়াহু নির্বাচনে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ ও অর্থের প্রবাহ নিয়ে গুরুতর সন্দেহ পোষণ করেছেন। এমনকি তিনি আরব নাগরিকদের আনুগত্য নিয়েও প্রশ্ন তুলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। পরে তিনি নেতানিয়াহুর সমালোচকে পরিণত হন। বুধবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, নির্বাচনে বিদেশি শক্তিগুলো অর্থ ঢেলেছে বলে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নেতা ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠন করা সম্ভব না হয়, তবে প্রেসিডেন্ট পুনরায় নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। বর্তমান পার্লামেন্টে নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৫৩, আর আইজেনকোটের বিরোধী জোটের দখলে রয়েছে ৪৮টি আসন। আইজেনকটের বিরোধী জোট যদি তাদের সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করতে চায়, তাহলে দল দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইসরাইলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে দলটির আসনসংখ্যা সাত। তাদের মতে, ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ এই সম্প্রদায়ের হলেও তাদের জন্মহার তুলনামূলক বেশি।

