জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তি পুনরায় ফিরে এলে তা দেশের সবার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে সতর্ক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জাতীয় ঐক্য: সংকট উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, এই পরাজিত শক্তি এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের মোকাবিলা করার সক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বিশেষ কোনো ঘরানা কিংবা কেবল বর্তমান সরকারের নেই। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে। ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। আমাদের ক্ষেত্রে পুরোনো শক্তি ফেরত এলে সেটি প্রত্যেককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
দীর্ঘ দুই দশকের নেতিবাচক রাজনৈতিক চর্চার ফলে জাতি মারাত্মকভাবে বিভক্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজে বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। মানুষকে কট্টরবাদী বা উদারপন্থী—এমন দ্বিমুখী অবস্থানে দাঁড় করিয়ে ‘লেবেলিং’ বা ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক যেমন ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪ সাল—এসবই আমাদের জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে ইতিহাসের পরম্পরাকে স্বীকার করে নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, ‘খুবই পদ্ধতিগতভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গত দুই দশকে আমরা বিভাজিত হয়েছি। আধুনিক মানুষ বনাম জঙ্গি মানুষ, ১৯৭১ বনাম ২০২৪—এসবের কোনো প্রয়োজন নেই।
বর্তমান সংকট উত্তরণে নিয়াজ আহমেদ খান তিনটি আশাব্যঞ্জক দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতা ও নেতিবাচক প্রচারণার মধ্যেও তরুণদের উদ্যোগে কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা জাতীয় ঐক্যের পথে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বিরোধী দলসহ গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের সব শক্তি যদি একটি অভিন্ন অবস্থানে আসতে পারে, তবে এখনো ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব। তৃতীয়ত, একটি সাধারণ শত্রু বা ‘কমন থ্রেট’ থাকলে মানুষ স্বভাবতই ঐক্যবদ্ধ হয়। সেই অভিন্ন শত্রুর মোকাবিলা এবং দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেই ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি অভিমত দেন। তাই এই অভিন্ন হুমকির বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য পরস্পরের হাত ধরে রাখা দরকার। তিনি বলেন, প্রথমত, নানা রকম ষড়যন্ত্র–ট্যাগিং ও লেবেলিংয়ের মধ্যেও তরুণদের কিছু প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। যত নড়বড়েই হোক, এসব তরুণ ও নবগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ঐক্যের পথে একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে, রাখছে। একটা কমন পয়েন্টে (অভিন্ন অবস্থান) আসতে পারলে গণ–অভ্যুত্থানকে সাক্ষী রেখে এখনো ঐক্য ধরে রাখার সুযোগ আছে। এ জন্য ঐক্য নষ্ট করতে এখন যেকোনোভাবে গণ–অভ্যুত্থানকে ছোট ও হালকা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সবাই বর্তমান সরকারের সাফল্য এবং দেশে স্থিতিশীলতা কামনা করেন বলে জানান তিনি। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বহু মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই নতুন সময়ে এসেছি। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, রাতারাতি এই বিভাজন দূর করা সম্ভব নয়। বরং পরিকল্পিতভাবে ঐক্যের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। রাজনীতির ওপরে গিয়ে আমরা সবাই চাই, বর্তমান সরকার সফল হোক, দেশে স্থিতিশীলতা থাকুক। আমরা মোটামুটিভাবে খেয়ে–পরে বেঁচে থাকতে চাই।
ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমীর সঞ্চালনায় সভায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রব, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোদাসসের হোসেন খান বীর প্রতীক, আবদুল হক, রুবি আমাতুল্লাহ, আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী ও মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন এবং জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর। এছাড়া মেজর (অব.) আমীন আহমেদ আফসারীসহ বিশিষ্টজনেরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।

