যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নাগরিক সংকট ও সরকারি নীতির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চিকিৎসা খরচ, সামাজিক নিরাপত্তার ভবিষ্যত, অভিবাসন নীতি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ভোটারদের পছন্দ নির্ধারণে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয়ে নানা মতামত পাওয়া গেছে।
মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরের বাসিন্দা ও পেশায় তথ্য বিশ্লেষক ৩৪ বছর বয়সী ব্রিটানি হ্যামলিন জানান, তিনি তাঁর অসুস্থ দাদির পরিচর্যা করেন। চিকিৎসা ব্যয় ও ওষুধের ক্রমবর্ধমান দামে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে সমর্থন দিয়েছেন। হ্যামলিনের মতে, এল-সায়েদ সামাজিক নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখা ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমানোর পক্ষে কাজ করছেন। বিপরীতে, রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স বড় বড় ওষুধ কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় যুক্ত থাকায় সাধারণ শ্রমজীবীদের কল্যাণে ভূমিকা রাখবেন না বলে মনে করেন তিনি।
ডেট্রয়েটের আরেক ৩৪ বছর বয়সী ভোটার নাতালিয়া টাউনসও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সায়েদের পক্ষে নিজের সমর্থনের কথা জানান। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের ঠিক আগে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্স কৃষ্ণাঙ্গদের একটি গির্জায় গিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। সেখানে রজার্সের পাশে এল-সায়েদের সাবেক দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেনস উপস্থিত ছিলেন, যিনি পরে রজার্সকে সমর্থন দেন। টাউনসের মন্তব্য, নির্বাচনের সময়ে সাময়িক উপস্থিতির চেয়ে সবসময় মানুষের পাশে থাকাটাই আসল বিষয়।
তবে ডেট্রয়েটের ৬৩ বছর বয়সী ভোটার পল স্টকিজ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর পরিকল্পনার সঙ্গে একমত নন। রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে ভোট দেওয়া এই নাগরিকের মতে, এল-সায়েদ যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তা বাস্তবায়ন করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে, যার চূড়ান্ত চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ করদাতাদের ওপর।
ইলিনয়ের শিকাগোতে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির প্রভাবকে ভোটের মূল বিষয় হিসেবে দেখছেন ২৯ বছর বয়সী সরকারি স্কুলশিক্ষক রায়ান ব্রাউন। তাঁর মতে, প্রশাসনের কঠোর অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর এক শিক্ষার্থীকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং সহযোগিতার আশ্রয় চাইছে। তবে ব্রাউন তিনি কাকে ভোট দিয়েছেন তা প্রকাশ করেননি।
আলাস্কায় সিনেট আসনটি নিয়ে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে, যার ওপর নির্ভর করছে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। সেখানে রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানকে চ্যালেঞ্জ করছেন ডেমোক্র্যাটদের সাবেক প্রতিনিধি মেরি পেলটোলা। একই সঙ্গে ব্যালটে একই নামের একাধিক প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে আলাস্কার বিমানবাহিনীর ২৭ বছর বয়সী সদস্য জেক ওয়েসলি জানান, ব্যালট পেপারে বর্তমান সিনেটরের পাশে তাঁর দায়িত্বের পরিচয় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকায় বিভ্রান্তির কোনো কারণ ছিল না। সুলিভানকে ভোট দেওয়া এই সামরিক সদস্যের মতে, বর্তমান অবস্থা সন্তোষজনক হওয়ায় পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে দক্ষিণ আলাস্কার কাসিলফ এলাকার ৪৫ বছর বয়সী জুডি ফিশার বর্তমান সিনেটরকে ভোট দিলেও, সমনামের প্রার্থীর কারণে ভোটে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি অন্যান্য ভোটারদের প্রার্থী সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে ভোট দেওয়ার পরামর্শ দেন।
টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থেও অভিবাসন নীতি এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ৪০ বছর বয়সী মারিয়া সেরদা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাঁর অনেক সহকর্মীকে আটক করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার ফলে পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া জ্বালানি তেল ও দৈনন্দিন পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই)-এর কর্মপদ্ধতি, বিশেষ করে হিস্পানিক সম্প্রদায়ের ওপর তাদের আচরণের কড়া সমালোচনা করেন তিনি।
অবশ্য অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন ফোর্ট ওয়ার্থের ৫৪ বছর বয়সী রাঁধুনি ভিক্টর গার্সিয়া। তবে তিনি উল্লেখ করেন, অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সঠিক ও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। এই সার্বিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, কেবল রাজনৈতিক দলের আনুগত্য নয়, বরং ব্যক্তিস্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার আলোকেই মার্কিন ভোটাররা এবার ব্যালটে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

