ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হলো ফিলিস্তিনি নাগরিক। তাহলে, ইসরাইলের এই ফিলিস্তিনি নাগরিকরা কারা। অথচ ইহুদি নাগরিকরা পরিচালিত হতেন বেসামরিক আইনের মাধ্যমে। এছাড়া ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও অপরাধী শনাক্তের হারও ইহুদি অধ্যুষিত এলাকার তুলনায় কম।
১৯৪৭ সালের আগে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল ফিলিস্তিনি আরব। তাদের একটি বড় অংশ নিজ বাড়িঘরে ফিরতে পারেননি।
বর্তমানে ইসরাইলে বসবাসরত এই ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ইতিহাস ও বর্তমান সংকট অত্যন্ত গভীর ও বহুমুখী। এই ভূখণ্ডটি বর্তমানে ইসরাইল, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা নিয়ে গঠিত।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলাকালীন জায়নবাদী মিলিশিয়া এবং পরবর্তীতে দেশটির সামরিক বাহিনী ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান পরিচালনা করে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের ভিটা থেকে বাস্তুচ্যুত হন, যা ফিলিস্তিনিদের কাছে ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় হিসেবে পরিচিত। ফিলিস্তিনিরা একে ‘নাকবা’ বা বিপর্যয় বলে অভিহিত করে। ১৯৪৭-৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাকে সংকটের অন্যতম কারণ বলে অভিযোগ করেন।
ওই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও যারা নিজ ভূখণ্ডে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিলেন, মূলত তাদের বংশধররাই আজকের ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিক। বর্তমানে এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ, যার মধ্যে মুসলিম, খ্রিষ্টান ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। তবে ইসরাইলি নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও তারা ভূমি, আবাসন, শিক্ষা ও সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। তাদের অনেকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিলেও প্রায় দেড় লাখ ফিলিস্তিনি ইসরাইলের ভূখণ্ডে থেকে যান।
রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ
১৯৪৮ সালের পর ফিলিস্তিনিদের নাগরিকত্ব প্রদান করা হলেও তৎকালীন ইসরাইলি সরকারগুলো তাদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখত এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতা চালিয়েছে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তারা সামরিক শাসনের অধীনে ছিল, যখন তাদের চলাচলে বিধিনিষেধ, কারফিউ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কঠোর বাধা দেওয়া হতো। ১৯৫৬ সালে কাফর কাসেমে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে ৪৯ জন নিহত হওয়া, ১৯৭৬ সালে ভূমি দিবস বিক্ষোভে ছয়জনের মৃত্যু এবং ২০০০ সালে ১৩ জন ফিলিস্তিনি নাগরিকের প্রাণহানি তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের করুণ অধ্যায়।
বৈষম্যের আইনি রূপ
- ১৯৫০ সালের ‘অ্যাবসেন্টিজ প্রপার্টি ল’–এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের পরিত্যক্ত হিসেবে চিহ্নিত সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
- ২০১৮ সালে পাস হওয়া ‘নেশন-স্টেট আইন’ জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেবল ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ করে, যা ফিলিস্তিনিদের সমান অধিকারের প্রশ্নকে জটিলতর করেছে।
- ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকায় ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ রয়েছে, যদিও সরকার তা অস্বীকার করে।
দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতে এই জনগোষ্ঠী কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বৈষম্য ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে তারা দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়েছে। হাদাশ, বালাদ, তা’আল ও রা’আম-এর মতো রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে। ২০২০ সালের নির্বাচনে যৌথ তালিকা ১৫টি আসন অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দেয়। ২০২১ সালে রা’আম দলের ক্ষমতাসীন সরকারে যোগদান ইসরাইলের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যা জোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে হাদাশ, বালাদ ও তা’আল পুনরায় যৌথ তালিকা গঠন করেছে, অন্যদিকে রা’আম আলাদা অবস্থান নিয়েছে। তবে নির্বাচনী এই প্রতিনিধিত্ব তাদের বাস্তব জীবনের বৈষম্য নিরসনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, সেটিই বর্তমানে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার এই সংগ্রাম ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। ২০২১ সালে রা’আম দল নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিয়ে ইসরাইলের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। দলটির চারটি আসন ওই সরকারের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে।

