যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের বৃহত্তম নগরী লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর)। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কাউন্টির কেন্দ্রগুলোতে ভোট গ্রহণ করার কথা রয়েছে। এই হেভিওয়েট নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছেন বর্তমান মেয়র কারেন বাস এবং সিটি কাউন্সিলের চতুর্থ ডিস্ট্রিক্টের সদস্য নিথিয়া রামান। ভোটের শেষ মুহূর্তেও দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। কারেন বাস: স্বাস্থ্যসেবাদাতা থেকে রাজনীতির শীর্ষে। দাবানল শুরুর সময় কারেন বাস দেশের বাইরে ঘানায় অবস্থান করছিলেন।
নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া দুই নেত্রীর রাজনৈতিক সম্পর্ক বেশ আকর্ষণীয়। একসময়ের রাজনৈতিক মিত্র নিথিয়া রামান ২০২৬ সালের মেয়র নির্বাচনের শুরুতে কারেন বাসকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তবে তার কয়েক সপ্তাহ পরই তিনি নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন। রামানের অভিযোগ, লস অ্যাঞ্জেলেস শহর তার বাসিন্দাদের মৌলিক সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং রাস্তাঘাট, ফুটপাতসহ নগর ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, অভিজ্ঞ রাজনীতি ও প্রশাসনিক মেয়াদের সাফল্য তুলে ধরে পুনরায় সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন কারেন বাস। একসময় রাজনৈতিক মিত্র থাকলেও এবার মেয়র পদে দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে শহরের রাজনীতিতে তীব্র আলোচনা ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তিনি চিকিৎসক নন; একজন ফিজিশিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্ট। ক্রাউলি পরে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতির অভিযোগ তুলে শহর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অন্যদিকে রামান অতীতে পুলিশের বাজেট কমানোর পক্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক প্রচারে বলেছেন, পুলিশের সদস্যসংখ্যা কমানো উচিত নয়।
ভোটের লড়াইয়ে আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারেন বাস তার প্রশাসনে দ্রুত সাশ্রয়ী আবাসন অনুমোদন এবং কার্যালয় ভবনকে আবাসনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া সহজ করার নীতি গ্রহণ করেছেন। তার জারি করা ‘এক্সিকিউティブ ডিরেক্টিভ ১’-এর অধীনে ইতোমধ্যে ১০ হাজারের বেশি সাশ্রয়ী আবাসন ইউনিট প্রস্তুত হয়েছে এবং আরও ৫০ হাজার ইউনিট নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে আছে। বিপরীতে নিথিয়া রামান জোর দিচ্ছেন উচ্ছেদ প্রতিরোধ, ভাড়া বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ এবং ভাড়াটেদের অধিকার জোরদার করার ওপর। রামান জয়ী হলে হাউজিং ডিপার্টমেন্টের অধীনে আলাদা দপ্তর খুলে অভিযোগ দ্রুত তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নগরীর অন্যতম বড় সমস্যা গৃহহীনতা মোকাবিলায় বাসের প্রধান পদক্ষেপ ছিল জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং ‘ইনসাইড সেফ’ কর্মসূচি চালু করা। মাদকাসক্তি, এইডস, অপরাধ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সংগঠিত করাই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
প্রশাসনিক তথ্যানুসারে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার গৃহহীন মানুষকে অস্থায়ী আবাসন, হোটেল ও মোটেলসমূহে স্থান দেওয়া হয়। ফলে কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তবে টানা দুই বছর এই সংখ্যা কমার পর ২০২৬ সালে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা আবার বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। অস্থায়ী আবাসনে থাকা অনেকেই স্থায়ী ঠিকানা না পেয়ে পুনরায় রাস্তায় ফিরে এসেছেন বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। নিথিয়া রামানের মতে, এই কর্মসূচির প্রতিটি ডলারের স্বচ্ছ হিসাব রাখা প্রয়োজন। তিনি রাস্তায় স্বাস্থ্যসেবা ও টেকসই আবাসনের প্রস্তাব এনেছেন। ২০১৭ সালে সিলভার লেক, ইকোপার্ক, লস ফেলিজ, অ্যাটওয়াটার ভিলেজ ও হলিউড এলাকার গৃহহীন মানুষের সহায়তায় ‘সেলাহ নেবারহুড হোমলেস কোয়ালিশন’ প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হন তিনি। এ ছাড়া ভবনের সামগ্রিক ইউটিলিটি খরচ ভাগ করে নেওয়ার পদ্ধতি ‘রেশিও ইউটিলিটি বিলিং সিস্টেমের’ ক্ষেত্রে হিসাব স্বচ্ছ করা এবং ভাড়াটেদের অভিযোগের সুযোগ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
১৯৫৩ সালের ৩ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম নেওয়া কারেন বাসের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে। তিনি দক্ষিণ লস অ্যাঞ্জেলেসে ১৯৯০ সালে ‘কমিউনিটি কোয়ালিশন’ প্রতিষ্ঠা করে মাদক, অপরাধ ও সামাজিক বৈষম্য প্রতিরোধে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন এবং ২০০৮ সালে কোনো যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য আইনসভার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী স্পিকার হওয়ার সাফল্য অর্জন করেন। বাস ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে সদস্য ছিলেন। এরপর ২০২২ সালে রিক কারুসোকে হারিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের ৪৩তম মেয়র এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়েন। এরপর ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
অন্যদিকে, ভারতের কেরালায় জন্ম নেওয়া নিথিয়া রামান মাত্র ছয় বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষে এমআইটি থেকে নগর পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এর আগে ভারত ও লস অ্যাঞ্জেলেসে আবাসন অধিকার এবং গৃহহীনদের নিয়ে কাজ করেন রামান। ২০২০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলের চতুর্থ ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস তৈরি করেন তিনি, কারণ তিনি ছিলেন সিটি কাউন্সিলের প্রথম দক্ষিণ এশীয় সদস্য। ২০২৪ সালে তিনি পুনরায় ওই পদে নির্বাচিত হন। পড়াশোনা শেষে ভারতের চেন্নাই ও দিল্লিতে নগর দারিদ্র্য, বস্তিবাসীর অধিকার, পানি-স্যানিটেশন এবং ভূমির অধিকার নিয়ে কাজ করেন তিনি।
নগর প্রশাসনের দক্ষতা এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে কারেন বাসের মেয়াদে বেশ কিছু সমালোচনার জন্ম হয়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্যালিসেইডসে ভয়াবহ দাবানলে ১২ জনের মৃত্যু ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা ঘানা সফরে থাকায় বাসের অনুপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক বাড়িয়ে দেয়। দাবানল-পরবর্তী পুনর্গঠনে অসন্তোষ তৈরি হয় এবং সাবেক ফায়ার চিফ ক্রিস্টিন ক্রাউলিকে বরখাস্ত করার ঘটনায় আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া ২০২৬ সালে বয়েল হাইটসের একটি গুদামে অগ্নিকাণ্ডের পর দীর্ঘদিন এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে থাকায় প্রশাসনিক জরুরি সাড়া নিয়ে মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এতে হাজার হাজার বাড়িঘর ও স্থাপনা ধ্বংস হয় এবং অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ২০২৬ সালে বয়েল হাইটস এলাকার লাইনেজ কোল্ডস্টোরেজ গুদামে অগ্নিকাণ্ডের পর পচে যাওয়া মাংসের দুর্গন্ধ প্রায় দুই মাস ধরে এলাকায় ছড়িয়ে ছিল, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তিতে ফেলে। তবে প্রচারে নেমে কারেন বাস এসব সমালোচনার জবাবে তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন অর্জনের কথাই তুলে ধরছেন।
পুলিশ বিভাগের ভূমিকা নিয়ে দুই প্রার্থীর অবস্থানে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। কারেন বাস বর্তমান লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের (এলএপিডি) প্রধান জিম ম্যাকডোনেলকে সমর্থন করেন এবং ২০২৮ সালের অলিম্পিকের আগে পুলিশ সদস্য বৃদ্ধির পক্ষে। তবে রামান প্রশাসনিক ব্যয় ও নীতি কাঠামোর সংস্কার চান। অলিম্পিক আয়োজনের আগে এবং নগর অবকাঠামোর বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোটাররা অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস রাখবেন নাকি পরিবর্তনের সূচনা করবেন, সেটাই দেখার বিষয়। বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয়, গৃহহীন মানুষের সংখ্যা, পুলিশের ভূমিকা, নগরের অবকাঠামো, দাবানলের পর পুনর্গঠন এবং ২০২৮ সালের অলিম্পিক আয়োজন—সবকিছুই নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আস্থা ফেরাতে তিনি পুলিশ নেতৃত্বে পরিবর্তন চান।
নির্বাচনের সময় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং অন্য এশীয় ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে লিটল বাংলাদেশের অর্কিড কিচেন রেস্তোরাঁয় বাসের উপস্থিতিতে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হয়, যেখানে স্থায়ী কমিউনিটি সেন্টার ও বিদ্বেষমূলক অপরাধ মোকাবিলার দাবি জানানো হয়েছিল। ২৯ সেপ্টেম্বর স্কারবল কালচারাল সেন্টারের এক ফোরামে কারেন বাস গাজায় ইসরায়েলি সামরিক আক্রমণকে ‘গণহত্যা’ মানতে অসম্মতি জানান। অন্যদিকে ৩০ অক্টোবর নিথিয়া রামানের টিম এশিয়ান ডেমোক্র্যাটস অব এলএ কাউন্টি এবং অন্যান্য যৌথ সংগঠনের শাকিল সৈয়দের সহায়তায় লিটল বাংলাদেশে জোরালো প্রচার চালায়।
নির্বাচনী অর্থ সংগ্রহেও দুই শিবিরের মধ্যে বড় অঙ্কের পরিসংখ্যান দেখা গেছে। অক্টোবর মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, কারেন বাসের তহবিলে ৩৪ লাখ ডলার এবং নিথিয়া রামানের তহবিলে প্রায় ৩০ লাখ ডলার ছিল। তবে রামানের সমর্থনে স্বাধীন প্রাক-কমিটি ‘এস্তামোস কন নিথিয়া’ ১০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছে। বিপরীত দিকে পুলিশ প্রটেকটিভ লিগ সম্পর্কিত কমিটি রামানের বিরুদ্ধে ৪৮ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। জরিপে দেখা গেছে, দুজনই ৪০ শতাংশ সমর্থনের জায়গায় সমানে সমান অবস্থায় আছেন, যেখানে ১৯ শতাংশ ভোটার সিদ্ধান্তহীন। ভোটারদের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই ঠিক করবে লস অ্যাঞ্জেলেসের আগামী চার বছরের প্রশাসনিক নেতৃত্ব। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত কারেন বাসের প্রচার তহবিলে প্রায় ৩৪ লাখ ডলার এবং নিথিয়া রামানের তহবিলে প্রায় ৩০ লাখ ডলার জমা পড়ে। শেষ এক মাসে বাস সংগ্রহ করেন ৮ লাখ ২৭ হাজার ডলার এবং রামান সংগ্রহ করেন ৪ লাখ ৮৫ হাজার ডলার। তবে শেষ পর্যায়ে হাতে থাকা অর্থের হিসাবে রামানের তহবিলে ছিল প্রায় ১৪ লাখ ডলার, যা বাসের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

