চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলূম বাবুনগর মাদ্রাসার ১০৪তম বার্ষিক দ্বীনি মহাসম্মেলনে যোগ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন যে, বিগত শাসনামলের ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগকে আর এ দেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেয়া হবে না। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে তিনি বলেন, যারা মানুষ হত্যা, গুম, গণহত্যা এবং সীমাহীন নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছিল অথচ এখন পর্যন্ত অনুশোচনা প্রকাশ করেনি, তাদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ গুম-খুন ও নির্যাতনের মাধ্যমে দেশকে বিপর্যস্ত করে ক্ষমতা থেকে পালিয়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত ১৬ থেকে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী ও আলেম-ওলামাবিরোধী শাসন থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া গত প্রায় দেড় দশকে তিন হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন এবং সাত হাজার মানুষ বিভিন্ন ধরনের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। মন্ত্রী বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং আলেমদের ওপর নির্যাতনের স্মৃতি দেশবাসী এখনো ভুলতে পারেনি, তাই এমন শক্তির পুনরাগমন কোনোভাবেই কাম্য নয়। শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামাদের হত্যা করা হয়েছে, মসজিদ রক্তাক্ত করা হয়েছে। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ও দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। শাপলা চত্বরে অনেক আলেম-ওলামা রক্ত দিয়েছেন। তাদের অনেকের নাম ও কবরের ঠিকানাও এখনো জানা যায়নি। আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা কি আবার সেই ফ্যাসিবাদীদের পুনরাগমন চাই। তিনি আরও বলেন, তারা মুখে এক কথা বলে, কিন্তু তাদের দলিলে কী আছে, সেটি বলে না। তাহলে সেই ক্ষেত্র আজকে কারা তৈরি করে দিচ্ছে। পরে তিনি মহাসম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন।
দেশের গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির নেপথ্যে ফ্যাসিবাদী শক্তির ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে বলেন, একটি গোষ্ঠী ইসলামের নাম ব্যবহার করে রাজনীতি করলেও তাদের দলীয় ইশতেহারে শরিয়াভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। মন্ত্রী আরও জানান, বিএনপি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতি বজায় রাখতে চায়। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে তিনি বলেন, সংবিধান থেকে বাদ দেয়া ইসলামী মূল্যবোধ, আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিসমিল্লাহ পুনরায় সংযোজন করা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে গার্মেন্টস খাতে শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব ঘটনার পেছনে ফ্যাসিবাদী শক্তির ইন্ধন রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ বিএনপি অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে। তারা শরিয়াভিত্তিক আইন-কানুন ও শাসনব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয়নি। এমনকি তাদের দলীয় দলিল ও মনোগ্রাম থেকেও ‘আকিমুদ্দীন’ বাদ দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, বিভ্রান্তি ছড়ানোর পরিবর্তে গঠনমূলক সমালোচনা ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সরকারকে সহযোগিতা করা যেতে পারে, তবে দেশের মানুষের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করা উচিত নয়।
সম্মেলন শুরুর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও বাবুনগর মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে একান্ত সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। এ সময় অন্যদের মধ্যে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া ও পুলিশ সুপার মাসুদ আলম উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন অধিবেশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামারা সমবেত হন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ২৩ বছর সময় লেগেছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭।

