প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ৭ই নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ম্যাগনাকার্টা। শনিবার রাজধানীর বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে ‘ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ও সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) ৩ হাজার ক্যাডেট এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জন একটি ঐতিহাসিক গৌরব। তবে এই গৌরবের পতাকাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলা প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব। তরুণ প্রজন্মের উচিত স্বাধীনতার মূলমন্ত্রকে ধারণ করে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করা। তিনি আরও বলেন, ইতিহাস সাক্ষী, যতবারই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে বা গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে, ততবারই ৭ নভেম্বরের ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের চেতনায় বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই দিনে দেশপ্রেমিক জনগণের দীপ্ত উচ্চারণ হোক—দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ। বর্তমান সরকার একটি সমৃদ্ধ আগামী বিনির্মাণে বদ্ধপরিকর।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওইদিন দেশপ্রেমিক সিপাহী ও জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সকল চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। ওই বছরের নভেম্বরের শুরুতে ষড়যন্ত্র চরম আকার ধারণ করে। ২ নভেম্বর দিবাগত মধ্যরাতে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে গৃহবন্দি করে যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, তা সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল এবং সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ধূলিসাৎ করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে তাদের পরাজয় ঘটেছিল। এ কারণেই দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী, গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যের চেতনার বাতিঘর। দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যেভাবে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলো, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও প্রায় একইভাবে সিপাহী জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে এসে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিরোধী সকল ষড়। অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, তারুণ্যের সকল সম্ভাবনাকে বিকশিত করার প্রয়োজনীয় এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
তারেক রহমান বলেন, পরাজিত অপশক্তি এরপরও থেমে থাকেনি। মহাজোটের নামে একজোট হয়ে তারা দেশকে পুনরায় তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত করা হয়েছিল এবং ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে হাজারো শহীদের রক্ত ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই অপশক্তির পুনরায় পরাজয় ঘটেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সালের লড়াই ছিল সেই স্বাধীনতা রক্ষার।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সময়ের বিচারে প্রমাণিত হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ণয়ের দিন। ৭ নভেম্বরের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অর্থই হলো দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়া। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের তারুণ্য জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ না হলে জনগণের ঐক্য সুদৃঢ় হয় না। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫-এর সিপাহী জনতার বিপ্লব, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে তরুণরা প্রমাণ করেছে যে, দেশের স্বার্থে তারা আপোষহীন। দেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের শত্রু মিত্র চিহ্নিত করার দিন।
ভবিষ্যতে যাতে কেউ দেশের অধিকার হরণ করতে না পারে বা দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে ৭ নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লবের চেতনাকে মনে-প্রাণে ধারণ করতে হবে। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য।

