গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটের ঘটনা ঘটে।
১৭৪ জন যাত্রী নিয়ে ওমানের আকাশসীমায় থাকা অবস্থায় উড়োজাহাজটির মূল পাইলট স্মিথ মছারের ওপর অতর্কিত হামলা চালান সহ-পাইলট। এ ঘটনায় ভারতীয় পাইলট স্মিথ মছারের সাহসিকতা দেশে–বিদেশে প্রশংসায় ভেসেছে। বোয়িং ৭৩৭ মডেলের উড়োজাহাজটি মাঝ আকাশে থাকা অবস্থায় সহ–পাইলট ‘ক্র্যাশ এক্স’ (ককপিটে রাখা কুঠারের মতো সরঞ্জাম) দিয়ে হঠাৎ স্মিথ মছারের ওপর হামলা করেন। পাইলট, মিস্ত্রি, দন্তচিকিৎসক—কার কার চেষ্টায় রক্ষা পেল ইসরায়েলগামী উড়োজাহাজটি।
কুঠারের মতো দেখতে ‘ক্র্যাশ এক্স’ নামক সরঞ্জাম দিয়ে করা সেই হামলায় রক্তাক্ত হন স্মিথ মছার।
হামলাকারী যাত্রীসহ উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
সেই আকস্মিক হামলায় উড়োজাহাজটি মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ১৬ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়। ‘মনে হচ্ছিল উড়োজাহাজ না, রোলারকোস্টার, হুড়মুড়িয়ে নিচে নামছিল’।
ককপিটের দরজা খুলে স্মিথ মছার রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র জানান, ওই সংকটময় মুহূর্তে ককপিটে থাকা হামলাকারীকে প্রতিহত করতে এগিয়ে আসেন যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুন। হায়ুন জানান, তিনি ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে সরিয়ে দিয়ে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। উড়োজাহাজটির স্টিয়ারিং কন্ট্রোল টেনে সোজা করার মাধ্যমে তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর পরপরই সৌদিতে উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণ করানো হয়। আক্রান্ত পাইলট স্মিথের সাহসিকতায় ঠেকানো যায় হামলাকারীকে। ককপিটে হামলাকারীকে প্রতিহত করতে এগিয়ে যাওয়া ইয়ানিভ হায়ুন বলেছেন, উড়োজাহাজটি যখন দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করেছিল, তখন তিনি ককপিটের দিকে ছুটে যান।
ওই বিপর্যয়ের সময় উড়োজাহাজটিতে যাত্রী হিসেবে থাকা ফিজির পাইলট হেনসন স্টিভেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পাইলট রোয়ান টুথ সাহসিকতার পরিচয় দেন। তাদের সহায়তায় উড়োজাহাজটি নিরাপদে মাটিতে নামানো সম্ভব হয়। রোয়ান টুথ ২০২৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার এয়ারলিংকে দায়িত্ব পালন করেছেন, আর হেনসন অতীতে ফিজি এয়ারওয়েজে কাজ করেছেন। সৌদি আরব থেকে ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি ফেরত আনার সময়ও ছুটিতে থাকা এই দুই পাইলট দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এবার ওই দুই পাইলটের নামও প্রকাশ্যে এসেছে।
আহত পাইলট স্মিথ মছার আবুধাবির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জানান, প্রথম আঘাত পাওয়ার পর তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন উড়োজাহাজের কাঠামোগত কোনো বিপর্যয় ঘটেছে, কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারেন সেটি ছিল পরিকল্পিত আক্রমণ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারি কৌঁসুলিরা এই ঘটনার সঙ্গে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার মিল খুঁজে পেয়েছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগেই জানিয়েছিলেন যে, হামলাকারী ওমানের নাগরিক এবং তিনি কট্টরপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, যদিও তাঁর সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। মাঝ আকাশে উড়োজাহাজের ককপিটে মহাহট্টগোল। যদিও তাঁর এমন কর্মকাণ্ডের পেছনে ঠিক কী উদ্দেশ্য ছিল, তা জানা যায়নি।
যাত্রীদের প্রাণ বাঁচানোর স্বীকৃতিস্বরূপ সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান গত সপ্তাহে হেনসন, রোয়ান এবং উড়োজাহাজের অন্য ক্রুদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করেছেন। অসীম সাহসিকতা ও দায়িত্বশীলতার জন্য আহত পাইলট স্মিথ মছারকেও দেশটির অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে তাঁর আরও দুই মাস সময় প্রয়োজন বলে তিনি জানিয়েছেন।

