রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের তেঁতুলতলা বাজারে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এক বিশাল তেঁতুলগাছ। বাজারের দোকানপাটের ফাঁক গলে গাছটির ডালপালা চারদিকে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে মনে হয় গাছটিই এই জায়গার প্রধান অভিভাবক। স্থানীয়দের বিশ্বাস, গাছটির বয়স ১০০ বছরের বেশি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এই বয়সের কথা শুনে আসছেন তারা। প্রায় ৯০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা মো. ওয়াজিদ জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই গাছটিকে একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মো. ওয়াজিদের বয়স প্রায় ৯০ বছর। তিনি বলেন, রাজশাহীতে কোথাও তেঁতুলতলা বাজারের কথা বললে মানুষ এই জায়গা চিনতে পারে। তেঁতুলগাছটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকেও অনেকে এই বাজারে আসেন।
গাছটির নাম থেকেই বাজারের নামকরণ হয়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। চার দশকের বেশি সময় ধরে চলে আসা এই বাজারটি একসময় নির্জন হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বসতি ও দোকানপাট গড়ে উঠেছে। শুরুতে এখানে মাটির দোকান থাকলেও বর্তমানে তা সংখ্যায় বেড়েছে। দোকান নির্মাণের সময় গাছের ডালপালা অক্ষত রাখা হয়েছে। যেমন, চা বিক্রেতা মো. মজদুলের দোকানের ভেতর দিয়েই ঢুকে পড়েছে গাছের একটি বড় ডাল। ১৩-১৪ বছর ধরে সেখানে ব্যবসা করা মজদুল জানান, দোকান তৈরির অনেক আগে থেকেই ডালটি সেখানে ছিল, তাই তা কাটার প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। কোনো ডাল ঢুকে পড়েছে দোকানের ভেতরে, কোনোটি ছুঁয়েছে ছাদ। গাছের গোড়া বাঁধানো হয়েছে ইট দিয়ে। চা-দোকানি মো. মজদুলের (৫০) দোকানের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে গাছের একটি ডাল।
গাছটিকে ঘিরে স্থানীয়দের আবেগ ও পরিচর্যা অটুট। নিয়মিত গাছের গোড়া পরিষ্কার রাখা ও শুকনো ডাল সরানোর কাজ স্থানীয়রাই করে থাকেন। এছাড়া রাতে গাছের ডালে বকসহ নানা ধরনের পাখির নিরাপদ আশ্রয় গড়ে ওঠে। বাবু মণ্ডলের (৬৫) মতে, স্থানীয়দের কাছে এই জায়গাটি তেঁতুলতলা বাজার হিসেবেই পরিচিত। তিনি জানান, এই তেঁতুলগাছ থেকে যে কেউ ইচ্ছামতো তেঁতুল পেড়ে নিতে পারেন; কোনোভাবেই তা বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা হয় না। বরং ছোটবেলায় গাছে চড়ার সুখস্মৃতি এখনো অনেকের মনেই জীবন্ত। স্থানীয় বাবু মণ্ডল (৬৫) জানান, যার যত ইচ্ছা এই গাছ থেকে তেঁতুল পেড়ে খেতে পারেন। গাছটি ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নানা রকম ধারণাও প্রচলিত আছে।
তবে গাছটির তেঁতুল ফলন আগের তুলনায় অনেকটা কমে গেছে। এর জন্য স্থানীয়রা আশপাশের ইটভাটার ধোঁয়াকে দায়ী করছেন। চা বিক্রেতা মজদুল জানান, এলাকার আশেপাশে অন্তত ২৪টি ইটভাটা রয়েছে। সেগুলোর বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে গাছের পাতা ঝরে পড়ছে এবং কেবল তেঁতুল গাছ নয়, এলাকার আম-কাঁঠালসহ অন্যান্য ফলের গাছও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাছটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং তার ছায়ায় বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে কাটাতে স্থানীয়রা পরিবেশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

