মিরপুর সুইমিং কমপ্লেক্সে সম্প্রতি শেষ হওয়া ৩৫তম জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতার শেষ দিনে সাঁতারুদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসব। কেউ রেকর্ড গড়তে ব্যস্ত, কেউ বা মেডেল গলায় ঝুলিয়ে কোচের সঙ্গে সেলফি তুলছেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্যের এই চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কঠোর বাস্তবতায় এসে থমকে যায়। আগামী বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় এসএ গেমসের আগে প্রতিযোগিতার এই ফলাফল দেশীয় সাঁতারুদের টাইমিংয়ের বড় ঘাটতি স্পষ্ট করে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে বর্তমান সময়ের চেয়ে অনেক বেশি উন্নতি প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে সাফল্যের আনন্দে মেতে উঠেছিলেন সাঁতারুরা। কিংবা আরও ভালো প্রস্তুতি না নেওয়ার হতাশায় ডোবেন প্রতিযোগীরা। এই আক্ষেপ দূর করতে ঘরোয়া প্রতিযোগিতাতেই আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্স নিশ্চিত করা জরুরি।
টুর্নামেন্টে সেরা পুরুষ সাঁতারু নির্বাচিত হয়েছেন সামিউল ইসলাম রাফি, যিনি মোট সাতটি সোনা জিতেছেন।
৫০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে তাঁর টাইমিং ২৫.৮১ সেকেন্ড। অথচ ২০১৯ সালের এসএ গেমসে এই ইভেন্টে রুপাজয়ী শ্রীলঙ্কার আকালঙ্কা পেইরিসের টাইমিং ছিল ২৪.৯৫ সেকেন্ড। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পদকের লড়াইয়ে পেইরিসের চেয়ে রাফি ০.৮৬ সেকেন্ড পিছিয়ে আছেন। ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে; রাফির ৫১.৮০ সেকেন্ডের টাইমিং ২০১৯ সালের এসএ গেমসের ব্রোঞ্জজয়ীর (৫০.৫৩ সেকেন্ড) চেয়েও ধীর। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পদকের জন্য তাঁকে ১.২৭ সেকেন্ড দ্রুত সাঁতার কাটতে হবে। নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে রাফি জানান, আসন্ন এসএ গেমসে ভালো করার জন্য জাতীয় পর্যায়ের পরবর্তী সময়ে নিজেকে আরও বেশি প্রস্তুত করতে চান তিনি। অর্থাৎ রাফির চেয়ে মাত্র ০.৮৬ সেকেন্ড এগিয়ে ছিলেন পেইরিস। ব্যবধানটাকে সামান্য মনে হলেও আন্তর্জাতিক পদকের লড়াইয়ে এমন ব্যবধানই বড় হয়ে ওঠে। নিজের এই সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারছেন রাফিও, ‘অবশ্যই আমি এসএ গেমসে পদক জিততে চাই। ২০১৬ সালের এসএ গেমসে এই ইভেন্টে ব্রোঞ্জজয়ী বাংলাদেশের শরিফুল ইসলামের চেয়ে তিনি ০.২ সেকেন্ড এগিয়ে ছিলেন। পদকের স্বপ্ন বাস্তবায়নে শুধু আশাবাদই অবশ্য যথেষ্ট নয়।
ব্রেস্টস্ট্রোকে সুকুমার রাজবংশীর টাইমিং ৩০.২১ সেকেন্ড। অথচ ২০১৯ সালে এসএ গেমসে রুপাজয়ী মোহাম্মদ আরিফুলের টাইমিং ছিল ২৮.৩৬ সেকেন্ড, যা সুকুমারের চেয়ে ১.৮৫ সেকেন্ড ভালো। নারী সাঁতারুদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও প্রকট। সেরা সাঁতারু ফাতিহা মাহতাব ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইল শেষ করেছেন ১ মিনিট ৩.৪৪ সেকেন্ডে, যেখানে ২০১৯ এসএ গেমসের ব্রোঞ্জজয়ী টাইমিং ছিল ৫৯.০৪ সেকেন্ড। আবার ৫০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে জুঁই আক্তারের ৩১.২৭ সেকেন্ডের টাইমিংও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের দিব্যা সতিজার (২৮.০০ সেকেন্ড) তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ২০১৯ সালের এসএ গেমসে এই ইভেন্টে ব্রোঞ্জজয়ীর টাইমিং ছিল ৫৯.০৪ সেকেন্ড, ব্যবধান ৪.৪০ সেকেন্ড। ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকেও ফাতিহার ১ মিনিট ১২.৯৪ সেকেন্ডের টাইমিং আন্তর্জাতিক পদকজয়ীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের চিত্রটিও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে পুরুষদের ৪০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে উন্নতি হয়েছে ধীরগতিতে। ২০২৩ সালে সেরা টাইমিং ছিল ৪ মিনিট ১৭.৫৪ সেকেন্ড, যা ২০২৪ সালে ৪ মিনিট ১৪.২৫ এবং ২০২৫ সালে ৪ মিনিট ৬.৪৪ সেকেন্ডে দাঁড়িয়েছে। তবে রাফি ব্যাকস্ট্রোকে নিয়মিত উন্নতি করছেন; ২০২৩ সালে তাঁর টাইমিং ২৬.৯০ সেকেন্ড থেকে কমে এখন ২৫.৮১ সেকেন্ডে নেমে এসেছে। মালয়েশিয়ার কাছে ৬ গোল খেলেন জিমি–আমিরুলরা। ২০২৪ সালে ২৬.৭৯, ২০২৫ সালে ২৬.০৫ হয়ে এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫.৮১ সেকেন্ডে।
সাঁতার ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক সেলিম মিয়া জানান, এসএ গেমস থেকে তারা খালি হাতে ফিরতে চান না। জাতীয় সাঁতার শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট কিছু সময় ছুটি ও নিবিড় প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে ফেডারেশনের। তিনি মনে করেন, টাইমিংয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি ঘটাতে পারলে এসএ গেমস থেকে দুই থেকে তিনটি সোনা পদক জয় করা সম্ভব। যদিও শুধু আশাবাদ দিয়ে পদক জেতা সম্ভব নয়, এর জন্য আন্তর্জাতিক মানের টাইমিংয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এটাও ঠিক টাইমিংয়ে আরেকটু উন্নতি করা গেলে গেমসে অন্তত দুই–তিনটা সোনা পাওয়া যাবে।’। জেলে-কন্যা লিকার হাতে জাতীয় ব্যাডমিন্টনের শিরোপা, কাঁদলেন মা-মেয়ে।

