মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় গ্রাফটিং বা জোড়া কলম পদ্ধতিতে টমেটোর চারা উৎপাদন এখন এক লাভজনক শিল্পে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুরে।
আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও ও নাজাতকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৩০০টি নার্সারি। এ পদ্ধতিতে তিত বেগুন বা বনবেগুনের শক্ত শিকড়ের ওপর টমেটোর চারা জুড়ে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট অংশ কেটে পলিথিন দিয়ে বেঁধে তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে দুটি অংশ জোড়া লাগানো হয়। এরপর চারাগুলো পরিচর্যার ঘরে ১০ থেকে ১২ দিন রেখে শক্ত করা হয়। এই চারা সাধারণ টমেটোগাছের তুলনায় অনেক বেশি মজবুত হয় এবং সহজে ঢলে পড়ে না। সাধারণ জাতের টমেটো যেখানে তিন মাস বাঁচে, সেখানে গ্রাফটিং চারা আট মাস পর্যন্ত টিকে থাকে ও ফল দেয়। জোড়ার স্থানটি পলিথিন দিয়ে বেঁধে বিশেষ পরিচর্যায় রাখা হয়। ক্যাপশন ২: তিত বেগুনের শিকড়ের সঙ্গে টমেটোর অংশ জুড়ে তৈরি হচ্ছে গ্রাফটিং চারা। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা তৈরির জন্য প্রথমে তিত বেগুন বা বনবেগুন ও টমেটোর আলাদা বীজতলা তৈরি করা হয়। তিত বেগুনের চারা উপযুক্ত হতে সময় লাগে প্রায় ৩৫ দিন। টমেটোর চারা তৈরি হতে লাগে প্রায় ২৫ দিন। পরে স্বাস্থ্যবান ও সমান আকারের চারাগুলো বাছাই করে গ্রাফটিং করা হয়। গ্রাফটিং চারা বানানোর প্রায় ৩০০ নার্সারি আছে কমলগঞ্জে। চাকরি থেকে অবসরের পর সেনাবাহিনীর একটা প্রজেক্টে রংপুরে গিয়ে গ্রাফটিং টমেটোর চারা তৈরির কাজ শেখেন। সেখানে দীর্ঘদিন কাজ করার পর কমলগঞ্জে এসে এই চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন। তাই যিনি একবার এই কাজ শেখেন, তিনি আর এ কাজ ছেড়ে যান না।
চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ ও গ্রাফটিং চারার নার্সারি গড়ে উঠেছে। বছরে প্রায় ৬৫ লাখ চারা উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি চারা ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হওয়ায় এ খাত থেকে বছরে সাত কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসব চারা শুধু কমলগঞ্জেই নয়, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ ও কক্সবাজারসহ দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। এই কাজের সাথে বর্তমানে প্রায় হাজারো কৃষক যুক্ত রয়েছেন এবং তাদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এসব চারার জীবনকাল বেশি হওয়ায় এর চাহিদা শুধু কমলগঞ্জেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ব্যাপক।ক্যাপশন ৩: বিভিন্ন স্থানে চারাগুলো পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
নার্সারিগুলোতে দিন-রাত তিন শিফটে শ্রমিকরা কাজ করছেন। শ্রমসাধ্য এই কাজে দক্ষতার ওপর নির্ভর করে একজন শ্রমিক দিনে ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি চারার গ্রাফটিংয়ের জন্য একজন শ্রমিক এক টাকা মজুরি পান। আরিফ হাইব্রিড টমেটো নার্সারি অ্যান্ড প্রোডাক্টসের মালিক এম এ করিম জানান, সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর তিনি এই কাজ শিখেছিলেন এবং এখন তার নার্সারিতে সপ্তাহে প্রায় ৮০ হাজার চারা তৈরি হয়। এখানে প্রায় ৬০ জন শ্রমিক কাজ করেন। কর্মীরা জানান, অন্য সাধারণ কাজের তুলনায় এখানে মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা বেশি হওয়ায় তারা এই পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। দৈনিক একেকজন শ্রমিক ১ হাজার ২০০ পর্যন্ত চারা তৈরি করতে পারেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, গ্রাফটিং চারা রোগবালাই প্রতিরোধে সক্ষম এবং অধিক উৎপাদনশীল হওয়ায় এর চাহিদা ব্যাপক। এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার জানান, তিনি কয়েকটি নার্সারি পরিদর্শন করেছেন। এটি এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় খাত। কৃষকরা যাতে আরও উন্নতভাবে চারা উৎপাদন করতে পারেন এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার চাষিরা যেন সহজে এগুলো সংগ্রহ করতে পারেন, সেজন্য সরকারিভাবে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

