১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিমানবন্দর-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে চলা এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটলেও এখন প্রশ্ন উঠেছে এর বিপুল আর্থিক ক্ষতি ও ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে। গলার কাঁটা বিআরটি: সমাধান হতে পারে ‘এক্সপ্রেস আরবান করিডর’। আর ডান দিকে দরজার বিশেষ বাস করিডরের বাইরে চলতেই পারত না। তাই তিনটি প্রশ্ন আলাদা: বাতিলের সিদ্ধান্ত ঠিক কি না, বাতিলের খরচ কত এবং ১৪ বছরের ব্যর্থতার দায় কার। কর্ণফুলী টানেলে প্রথম বছরেই প্রতিদিন ১৮ হাজার ৪৮৫টি গাড়ি চলার পূর্বাভাস ছিল।
২০১২ সালে একনেকে যখন প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়েছিল, তখন এর ব্যয় প্রাক্কলন ছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা এবং ২০১৬ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তিন দফা সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। সবশেষ ২০২৫ সালে চতুর্থ দফায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হলে অন্তর্বর্তী সরকারের একনেক তা ফিরিয়ে দেয়। বিস্ময়কর হলো, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেলেও রাস্তায় একটি বিশেষ বাসও নামেনি। পেশাগত সূত্রে দেশের প্রায় সব মেগা প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার, এই বিআরটি প্রকল্পেও। বারবার চোখে পড়েছে অনিরাপদ কাজ, ভুল পরিকল্পনা আর ভেতরের চুরি। চীনা ঠিকাদারকে নিরাপত্তার কথা বলেও শোনানো যায়নি। ২০২৬ সালের জুনে সংসদে সেতুমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, এখনো মাসে টোল আদায় হয় ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, অথচ ব্যয় ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। প্রায় পাঁচ গুণ ভুল এই পূর্বাভাস কে তৈরি করেছিলেন, কে যাচাই করেছিলেন, কে সই করেছিলেন—আমরা জানি না। তবু রাজউক সমীক্ষা ছাড়াই ১৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। নিয়ম ভাঙার ফাইল তৈরি হয় কর্মকর্তার টেবিলেই। কাজ শুরুর পর ধরা পড়ে, পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই, সেবা সংস্থাগুলোর লাইন সরানোর পরিকল্পনা নেই, ব্যস্ত সড়কে যান চলাচলের বিকল্পও নেই। পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি, যারা তিন দফা সংশোধনও পাস করেছে ৫। কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর এখনো আসেনি।
এই প্রকল্পটি মূলত বিদেশি ঋণে পরিচালিত হচ্ছিল।
এর আওতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২৬ কোটি ডলার এবং ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা ৪ কোটি ইউরো ঋণ দিয়েছিল।
প্রকল্প বাতিল হলেও গৃহীত ঋণের মূল অর্থ ও সুদ পরিশোধের দায় সরকারকে বহন করতে হবে। অথচ প্রকল্পের সুফল ভোগ করা তো দূরের কথা, গাজীপুরের সাধারণ মানুষ ১৪ বছর ধরে অসহনীয় যানজট ও ধুলাবালির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে নানা নির্মাণজনিত দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সাতজন, যার মধ্যে ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট উত্তরায় গার্ডার দুর্ঘটনায় একই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। স্টেশন ও লেন বিভাজক ভেঙে করিডরটি সাধারণ মহাসড়কে পরিণত করা হবে। অথচ কত ঋণ ছাড় করা হয়েছে, সেই হিসাব খুঁজে পাইনি। সেই সময় এই অধম এ বিষয় নিয়ে অনলাইনে লিখেছিলাম; কিন্তু কিছুই হয়নি। সেই সব ভুলের দাম আজ আমাদের সবাইকে দিতে হচ্ছে। গঙ্গা ব্যারাজ নিয়েও আমি বারবার বলছি, ২০১৩ সালের পুরোনো সমীক্ষার ওপর ভর করে মূল চুক্তিতে গেলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে।
প্রকল্পের এমন চরম ব্যর্থতার পেছনে পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল স্পষ্ট। বুয়েট প্রকল্পটিকে পদ্ধতিগত ব্যর্থতা বলে অভিহিত করে পরামর্শক ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল ও বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিআরটি চালু হলেও বিমানবন্দরের কাছাকাছি এসে যাত্রীদের বাস পরিবর্তন করতে হতো, যা প্রকল্পটির উপযোগিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। প্রথম প্রশ্নের উত্তর মন্ত্রিসভা দিয়েছে; তৃতীয়টি নিয়ে কেউ মুখ খোলেনি। নিজের দপ্তর নিজেকেই দায়মুক্তি দিয়েছে।
শ্বেতপত্র কমিটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিগত সরকারের সাতটি বড় প্রকল্পে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ ছাড়াই ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রাক্কলন বাড়িয়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছিল।
উন্নয়নের নামে এভাবে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় অংশ ঘুষ, চুরি ও বাজেট বাড়িয়ে দেখানোর মাধ্যমে অপচয় হয়েছে। কমিটির অনুমান, ১৫ বছরে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৪ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার ঘুষ, চাঁদাবাজি, চুরি আর বাজেট বাড়িয়ে দেখানোর মাধ্যমে নষ্ট হয়েছে। শ্বেতপত্র কমিটির সদস্য অধ্যাপক এ কে এনামুল হকের মতে, ১৫ বছরে এডিপির ৪০ শতাংশ অর্থ আমলারা লুটপাট করেছেন।
এই বিশাল অপচয়ের পেছনে যে জবাবদিহিতার ঘাটতি ছিল, তা স্পষ্ট হয়েছে প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারীদের তালিকার মাধ্যমে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দীর্ঘ পথচলায় অন্তত ছয়টি স্তর ছিল যা কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই অনিয়মগুলোকে এড়িয়ে গেছে
- সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশার পরামর্শক।
- বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও প্রকল্প পরিচালক।
- মন্ত্রণালয়ের সচিব।
- পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি, যারা তিন দফা সংশোধন অনুমোদন করেছে।
- আইএমইডি।
- অর্থায়নকারী এডিবি ও ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা।
এই ব্যর্থতা উত্তরণে স্বাধীন তদন্ত ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। কোনো ধরনের ঢালাও শাস্তি নয়, বরং ৯০ দিনের মধ্যে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করে সমীক্ষা, নকশা ও সংশোধনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায় নিরূপণ করা উচিত। প্রকল্পের স্টেশনের লিফট, চলন্ত সিঁড়ি ও ইস্পাতের কাঠামো উন্মুক্ত নিলামে বিক্রির মাধ্যমে কিছু অর্থ পুনরুদ্ধারের পথ দেখা যেতে পারে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বেশ কিছু পদক্ষেপ জরুরি
- প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে একজন প্রকৌশলীকে প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, যিনি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কারিগরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখবেন।
- মন্ত্রণালয় থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা এবং সেই প্রতিবেদন সরাসরি সংসদে উপস্থাপন করা।
- উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) সচিব ও প্রকল্প পরিচালকের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে তাদের স্বাক্ষরিত প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করা।
- বড় প্রকল্পে পূর্ণকালীন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, যা কাউকে পদোন্নতির পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
- প্রকল্পের ব্যয় ২০ শতাংশের বেশি বাড়লে বা দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা।
লেখক পরিচিতি ও যোগাযোগের তথ্য
- সুবাইল বিন আলম: প্রকৌশলী-অর্থনীতিবিদ এবং টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক।
- ই-মেইল: contact@subail.com
- মতামত: লেখকের নিজস্ব।

