যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের ইতিহাসে এবার এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব ইতিহাসে বহুবার অন্য দেশের নির্বাচন প্রকাশ্য বা গোপনে প্রভাবিত করেছে। নির্বাচন নয়, যেন ধর্মযুদ্ধে নেমেছেন রিপাবলিকানরা।
সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট দলের পরাজয় নতুন কিছু নয়, তবে ডেমোক্র্যাটদের এই জয় মার্কিন ভোটারদের গভীর ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। আবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে সচরাচর এত বেশি ভোট পড়ে না—এবার আগাম ভোটে যা ঘটছিল। বলা বাহুল্য, গত কয়েক মাসের জরিপগুলোও এটাই জানাচ্ছিল।
গত ২০ বছরে প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান হওয়ার পরও কংগ্রেসের উভয় কক্ষে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের এমন আধিপত্য বিরল।
ভোটাররা কেবল নীতিগত কারণে নয়, বরং জিনিসপত্রের বাড়তি দাম ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা নিয়ে হতাশ হয়ে এই রায় দিয়েছেন। আগাম ভোটের নজিরবিহীন উপস্থিতি প্রমাণ করে, জনমনে জমে থাকা ক্ষোভের তীব্রতা ছিল আকাশচুম্বী।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক কৌশলের প্রভাব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আঘাত করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর আগ্রাসী নীতির ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে সুনামি তৈরি হয়, তার আঁচ লেগেছে মার্কিন নাগরিকদের জীবনে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, ট্রাম্পের নীতিগুলো জনগণের জীবনযাত্রার চেয়ে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। অভ্যন্তরীণ খাতের বরাদ্দ যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকেও ভোটাররা ভালোভাবে নেননি। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর আগ্রাসনে কোণঠাসা ইরান যখন হরমুজ প্রণালি খামচে ধরল, তখনই যুদ্ধের আসল ধাক্কা খেল বিশ্ব অর্থনীতি এবং সেই সুনামি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও আঘাত করল; যার পরিণতি আজকের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল। অনেকে বলছেন, সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমেরিকার ভোটাররা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে রায় দিলেন, সেটা যতটা নীতিগত, তার চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক। এটা অতীতেরও অভিজ্ঞতা, আমেরিকার সাধারণ সমাজের গণতান্ত্রিক বুঝ এবং নির্বাচনী সংস্কৃতি সচরাচর যতটা অর্থনীতি ও সমাজের জীবনযুদ্ধকে গুরুত্ব দেয়—ততটা দেয় না জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিগত বিষয়কে। ২০১৬ সাল থেকে গত এক দশকে ট্রাম্প শাস্তিযোগ্য অনেক নীতিগত অপকর্ম করেছেন। এই নির্বাচনে তথাকথিত ‘ট্রাম্প-দশকের’ কফিনে পেরেক বসছে বটে, কিন্তু সেই শাস্তি ইরান বা গাজার ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যাশার সামান্যই মেটাতে পারবে। এমনকি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধেও রায় নয় এটা। ভোটাররা মনে করেছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো তাঁদের অর্থনৈতিক জীবনকে বিবেচনায় নিয়ে নেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষ তাতে অবহেলিত বোধ করেছে। নিজেদের প্রেসিডেন্টের হাতে-পায়ে শিকল পরাতে চেয়েছেন তাঁরা এবং সেটা ভালোভাবেই হবে।
এই ফলাফল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় ধাক্কা। সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে ডেমোক্র্যাটদের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ড এখন কঠোর নজরদারিতে পড়বে। বিচারক নিয়োগ থেকে শুরু করে অভিবাসনবিরোধী নানা বিতর্কিত পদক্ষেপে ডেমোক্র্যাটরা এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবেন। বিশেষ করে সিনেটের বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় অস্ত্র বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রগতিশীল ধারার রাজনীতিবিদের উত্থান। বিশেষ করে মিশিগানে আবদুল আল-সাইদের বিজয় ডেমোক্র্যাট দলের অন্দরে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্বাস্থ্যনীতি ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কারণে পরিচিত পাওয়া এই প্রার্থীর জয় প্রগতিশীল শিবিরের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। এটি একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাট দলের অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ ও আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
জর্জিয়ার মতো সুইং স্টেটগুলোতে আফ্রিকান-আমেরিকান প্রার্থীদের জয় ডেমোক্র্যাটদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। কেইশা ল্যান্স বটমসের গভর্নর হিসেবে জয় এবং তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের রক্ষণশীল রাজনীতির প্রভাব শ্বেতাঙ্গ নিচুতলাতেও কমে আসছে। এমনকি দলের ভেতরেও এখন ট্রাম্পের বিরোধীরা মুখ খুলতে শুরু করবেন, যা তার একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শ্বেতাঙ্গ নিচুতলায় তাঁর প্রতি এভাবেই গত এক দশকের মোহ কেটে গেছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির শিরোনামে সরাসরি দাবি করা হয়েছে, রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের প্রধান কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এমনকি ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মন্তব্য করেছেন, মার্কিন নাগরিকরা সচেতনভাবেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যদি ট্রাম্প এরপরও যুদ্ধ চালিয়ে যান, তবে তা হবে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। কানসাসে ১৯৩২ সালের পর এবারই প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের বড় প্রমাণ। যদি প্রকৃতিই তাদের সংবিধানে লেখা গণতন্ত্রের মহান নীতিমালাকে ভোট দেওয়ার সময় তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিত, তাহলে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে জিততেন না এবং এবারও রিপাবলিকানদের পরাজয় হতো আরও ব্যাপক। জনজীবনে যুদ্ধ কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তার বড় প্রমাণ কানসাসে ১৯৩২–এর পর এই প্রথম একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হলেন।
ট্রাম্পের এই পরাজয় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব বিশ্বরাজনীতিতেও অনুভূত হবে। ইউরোপে ডানপন্থী শক্তির মোকাবিলায় থাকা আন্দোলনকারী ও কর্মীদের জন্য এটি নতুন অক্সিজেন হিসেবে কাজ করবে। তবে ট্রাম্প বা তার অনুসারীরা নিজেদের নীতি সংশোধন করবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ইতিহাসের এই পর্যায়ে এসে ট্রাম্পের একক ক্ষমতার দাপট অনেকটা ফিকে হয়ে এলেও আগামী দুই বছর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি কতটা অস্থিরতা বজায় রাখেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

