প্রায় ২৬ বছর পর বাবার সঙ্গে দেখা হলো, কিন্তু জীবন্ত অবস্থায় নয়। আজ বৃহস্পতিবার মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার ১০৫ নম্বর সীমান্ত পিলারসংলগ্ন শূন্যরেখায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সেখানে বাবার নিথর দেহ দেখার সুযোগ পান বাংলাদেশে বসবাসরত মেয়ে ফিরদৌসী খাতুন। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মানবিক বিবেচনায় বিজিবি ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এই বিশেষ ব্যবস্থার সুযোগ করে দেয়। বাবার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল প্রায় ২৬ বছর আগে; তবে মুঠোফোনে নিয়মিত কথা হতো। ফিরদৌসী খাতুন বলেন, ‘আমার যখন বিয়ে হয়েছিল, তখন সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না।
ফিরদৌসী খাতুনের বাবা মোনরুদ্দিন শেখ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার হৃদয়পুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। বয়সজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘ সাত বছর শয্যাশায়ী থাকার পর তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে ফিরদৌসী সবার বড়। ৪৫ থেকে ৫০ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয় মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের সোনাপুর নতুনপাড়ায়। বিয়ের পর থেকেই তিনি সেখানেই বসবাস করছেন। বয়সের ভারে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মোনরুদ্দিন শেখ।
দীর্ঘ সময় ধরে বাবা ও ভাইদের সঙ্গে নিয়মিত ভিডিও কল ও তাৎক্ষণিক বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ থাকলেও সামনাসামনি দেখা হওয়ার সুযোগ হচ্ছিল না ফিরদৌসীর।
তিনি জানান, বিয়ের সময় সীমান্ত উন্মুক্ত থাকলেও বর্তমানে পাসপোর্ট ও ভিসার কড়াকড়িতে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। সংসারের অভাব-অনটন এবং পাসপোর্ট-ভিসার খরচ বহন করা সম্ভব না হওয়ায় বাবার কাছে যাওয়ার আকুতি অপূর্ণ থেকে যায়। ২০০০ সালের মার্চ মাসে স্বামীসহ একবার সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ফিরদৌসী। সে সময় অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাঁর স্বামীকে ভারতীয় কারাগারে যেতে হয়েছিল, এরপর থেকে তারা আর কখনো ভারতে যাওয়ার সাহস করেননি। সংসারের টানাপোড়েন ও পাসপোর্ট–ভিসার খরচ জোগাতে না পারায় কেটে গেছে বছরের পর বছর। অবাধে সীমান্ত অতিক্রম করে দুই দেশে যাতায়াত করা যেত। দরিদ্র পরিবার হওয়ায় পাসপোর্ট–ভিসা করে যাব, তারও উপায় ছিল না।’। পরে কারাগার থেকে ছাড়া পেলে তাঁরা দেশে ফিরে আসেন।
বাবার মৃত্যুর খবর শুনে শেষবারের মতো মুখ দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন ফিরদৌসী। পরিবারের অনুরোধে চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) পক্ষ থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বিজিবি ও বিএসএফের পারস্পরিক সমন্বয়ে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সীমান্তের শূন্যরেখায় বাবার মরদেহ দেখার আয়োজন সম্পন্ন হয়।
এই মানবিক ঘটনায় বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বিজিবির মুজিবনগর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার এনায়েত হোসেন। অন্যদিকে ভারতের পক্ষে ছয় সদস্যের একটি দলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফের এএসআই সুনীল কুমার। চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান জানান, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মানবিক দিক বিবেচনা করেই দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বয়ে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

