দিল্লির স্বনামধন্য ও শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বর্তমানে এক চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকগুলো ঝালাই করে বন্ধ করে দেওয়ায় ক্যাম্পাসটি যেন একটি পুলিশি শিবিরে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এটি যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সাউথ ফার্স্ট অনলাইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ক্যাম্পাসের বাইরে ও মেট্রো স্টেশনের আশেপাশে প্রায় ১ থেকে ২ হাজার পুলিশ, আইটিবিপি সদস্য এবং আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন পুরো এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আশপাশের রাস্তাগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসের লোহার ফটকগুলো দেয়াল ও লোহার পাত দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে, যাতে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে বা বের হতে না পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে একাডেমিক কাজে বাধা, শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট এবং সম্পত্তি ধ্বংসের মতো গুরুতর অভিযোগ এনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। লাইব্রেরি, মেস, হোস্টেল ও শৌচাগারগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের বের করে দিতে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এমনকি অনশনরত শিক্ষার্থীদের জন্য বাইরে থেকে খাবার বা পানি আনার পথেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। আবার যারা ভেতরে আছেন, তাদেরও বাইরে আসতে দিচ্ছেন না। ‘আলোচনার’ অজুহাতে চাপ সৃষ্টি করে ভোরবেলা দুই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কাছে বাইরে থেকে খাবার বা পানি পৌঁছানোর চেষ্টা করলে কিংবা অনশনরতদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার উদ্যোগ নিলে তাতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তারা হোস্টেলে সুপেয় পানির সরবরাহ ও শৌচাগার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং লাইব্রেরি, ফি, ভর্তি প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান চান। তাদের ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন সরকার যৌথভাবে এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
গত ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই অনশন কর্মসূচি শনিবার ১৯তম দিনে গড়িয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, গত ১৭ অক্টোবর ভোরে পুলিশ ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাকর্মীরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অনশনকারীদের টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে দেয় এবং মারধর করে। নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগও উঠেছে। প্রশাসনের দাবি, শিক্ষার্থীরা আন্দোলন প্রত্যাহার করেছেন, তবে এই দাবিকে ‘কৌশল’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন শিক্ষার্থীরা। এবিন বাসিল ও রেহান খানসহ অনেকে এখনও আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তাদের সঙ্গে নতুন শিক্ষার্থীরাও যোগ দিচ্ছেন। গত ১৭ অক্টোবর ভোরে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশ মিলে ওই এলাকার সব আলো নিভিয়ে ফেলে।
এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে ছাত্র সংসদ নির্বাচন পুনরায় চালু করা। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় সর্বশেষ ২০০৫ সালে নির্বাচন হয়েছিল এবং ২০০৬ সালের মার্চ মাসে সেই কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে আর কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রশাসনের নির্দেশে এখন শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি কেবল বিভাগীয় সমিতি বা শ্রেণি প্রতিনিধিদের কাছে জানাতে পারেন, যা তারা অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জেএনইউয়ের মতো জামিয়াতেও নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার রয়েছে শতবর্ষেরও বেশি ইতিহাস। সেখানে ২৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন।
শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ছাত্র সংসদ পুনরায় চালু করা, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা এবং দ্রুত নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে ১৫ দিনের মধ্যে ভোট গ্রহণ করা। এছাড়া, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে জারিকৃত সব বহিষ্কারাদেশ ও কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রত্যাহার, হোস্টেলের পানির সুব্যবস্থা এবং লাইব্রেরি ও ভর্তিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের দাবিও রয়েছে তাদের।
১৯২০ সালের ২৯ অক্টোবর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতারা আধুনিক মূল্যবোধ ও স্বাধীন শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য নিয়ে জামিয়া মিলিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বর্তমান প্রশাসন ও সরকারের এই কঠোর অবস্থানকে একটি ‘আটক কেন্দ্র’ বা ডিটেনশন সেন্টারের সঙ্গে তুলনা করছেন। ক্যাম্পাসের এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতেও, বিশেষ করে ছাত্রীরা, তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই অব্যাহত রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নেমে আসা এ গভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে শিক্ষার্থীরা—বিশেষ করে ছাত্রীরা—গভীর রাতেও তাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে স্বাধীন ও জাতীয়তাবাদী আদর্শ এবং আধুনিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে তারা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। শিক্ষার্থীদের মতে, যে প্রতিষ্ঠানের রয়েছে এমন গৌরবময় ইতিহাস, সেই প্রতিষ্ঠানটিই আজ শিক্ষার্থীদের অধিকার দমন করছে; তাদের ওপর সহিংসতা চালাচ্ছে।

