জাতীয় নতুন শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি অতিরিক্ত আরেকটি বিদেশি ভাষা চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। নতুন এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ শিক্ষা প্রসারে বিশেষ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের। যেখানে পূর্বের পরিকল্পনায় মাত্র ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের কেন্দ্র তৈরির কথা বলা হয়েছিল। উচ্চমাধ্যমিকের পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই বিদেশি এই ভাষা চালুর একটি প্রাথমিক চিন্তা তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি কতটা, সেটিই বিবেচনার বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলা তুলনামূলকভাবে সহজ।
শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুবিধার্থে আরবি, চীনা, জাপানি, কোরীয়, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ ও ইতালীয়—এই আটটি বিশেষ ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষকসংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বড় বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে একই পাঠদান ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জটিল এক পরীক্ষা। দেশের সব স্কুলে রাতারাতি বিপুলসংখ্যক দক্ষ শিক্ষক তৈরি কিংবা নিয়োগ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। সেখানে অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে, এটি বড় প্রশ্ন।
শুধু ভাষাজ্ঞান থাকাই একজন শিক্ষকের জন্য যথেষ্ট নয়; ক্লাসে পড়ানোর আধুনিক পদ্ধতি, বয়সভিত্তিক পাঠদান এবং মূল্যায়নের সক্ষমতা থাকা জরুরি। কিন্তু বিদেশি এসব ভাষা শেখাতে কতজন শিক্ষকের প্রয়োজন হবে, তাঁদের বেতন-ভাতা বা পেশাগত উন্নয়ন কীভাবে হবে—সে সম্পর্কিত কোনো সুনির্দিষ্ট ও পরিষ্কার নীতিমালা এখনো সামনে আসেনি। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও আকর্ষণীয় সম্মানী নিশ্চিত না করা গেলে পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমেই আটকে থাকতে পারে।
একই সঙ্গে গ্রামীণ ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত অসমতা ভাষাগত নতুন বৈষম্য তৈরি করতে পারে। শহরের নামিদামি বা অভিজাত স্কুলগুলো হয়তো নিজেদের অর্থায়নে বিদেশি শিক্ষক রেখে শিক্ষার্থীদের ভাষা শেখাতে পারবে। কিন্তু বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি থাকা গ্রামের সাধারণ স্কুলগুলোর পক্ষে তা প্রায় অসম্ভব। ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ফারাক কমার বদলে বিদেশি ভাষার কারণে তা আরও বড় রূপ নিতে পারে।
আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিদ্যমান বাস্তবতাও এই ক্ষেত্রে একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। ২০২৩ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী দেড় হাজারের বেশি শিশুর ওপর পরিচালনা করা এক জরিপে উঠে আসে হতাশাজনক চিত্র। এতে দেখা যায়, প্রায় ৬২ শতাংশ ছেলে ও ৫৩ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী বাংলায় লেখা সাধারণ গল্পই ঠিকমতো পড়তে পারেনি। আর ইংরেজিতে গল্প পড়তে ব্যর্থ হয়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ ছেলে ও ৮৩ শতাংশ মেয়ে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা তাদের মাতৃভাষা ও মৌলিক ইংরেজিতেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ওই জরিপের তথ্য বলছে, বাংলায় গল্প পড়তে পারেনি প্রায় ৬২ শতাংশ ছেলে ও ৫৩ শতাংশ মেয়ে। অর্থাৎ অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক পাঠদক্ষতাই অর্জন করতে পারছে না (, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)।
এমন পরিস্থিতিতে প্রাথমিক ভিত মজবুত না করে নতুন একটি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হলে তা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টি করবে। তাই নতুন বিদেশি ভাষা শেখানোর তাগিদ দেওয়ার আগে মাতৃভাষা বাংলা ও মৌলিক ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের পারদর্শী করে তোলা আবশ্যক।
শিক্ষা প্রক্রিয়ায় সব শিক্ষার্থীর লক্ষ্য এক হয় না। কেউ কারিগরি লাইনে যাবে, কেউ উচ্চশিক্ষায় অংশ নেবে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হবে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যের স্বাস্থ্য বা সেবা খাতে কাজ করতে আগ্রহীদের জন্য আরবি কার্যকর হতে পারে; প্রযুক্তি বা শিল্প খাতে জাপানি ও কোরীয় ভাষা সহায়ক; আর আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রসারে চীনা ভাষার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। সুতরাং নির্দিষ্ট একটি ভাষা সবার ওপর বাধ্যতামূলক না করে শিক্ষার্থীর ঝোঁক ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। তবে ভাষা শেখার সঙ্গে উপযুক্ত কারিগরি ও পেশাগত জ্ঞান না থাকলে ভালো কর্মসংস্থান পাওয়া যাবে না। ‘রেমিট্যান্সের ভাষা’ আরবি, তবু প্রশিক্ষণে এত অবহেলা কেন।
উদ্যোগটিকে ফলপ্রসূ করতে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ভাষানীতি তৈরি করা প্রয়োজন। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নির্বাচিত কিছু স্কুলে পরীক্ষামূলকভাবে এই পাঠদান শুরু করা যেতে পারে, যা থেকে শিক্ষকসংকট, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া অনলাইনভিত্তিক শিক্ষক, আঞ্চলিক ভাষা শেখার কেন্দ্র ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের সীমাবদ্ধতা কাটানো যেতে পারে। তবে শিক্ষক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের রূপরেখা স্পষ্ট করেই সরকারকে এগোতে হবে বলে অভিমত দিয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক।

