সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ইসরাইলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন। মঙ্গলবার তিনি ঘোষণা করেছেন যে, ইসরাইলকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের যে সহায়তা দেওয়া হয়, তা বন্ধ করা হবে। তবে ফক্স নিউজে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই সিদ্ধান্তের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ব্যাখ্যা করেননি, যা তার এই পদক্ষেপের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। ফলে তার ঘোষণার প্রকৃত অর্থ ও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন সময়ে এল যখন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সম্পর্কের একটি জটিল পর্যায় চলছে। ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও, চলমান যুদ্ধে মার্কিন রিপাবলিকানদের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে এই ইস্যুটিকে দেখা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইলের সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ট্রাম্পের এই নতুন ভাষ্যকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলেছে। অন্যদিকে গত সপ্তাহের নির্বাচনে ইসরাইলে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের মতো স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে একাধিক রিপাবলিকান প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।
আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরাইলকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছে। মিশিগানের সিনেটর আবদুল আল-সাইয়েদসহ অনেক ডেমোক্র্যাট নেতা ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করছেন। আল-সাইয়েদের দাবি, ইসরাইলের স্বার্থে জড়িয়ে থাকা যুদ্ধে আমেরিকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে অনেকে এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। এ ছাড়া আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তিত গতিপ্রকৃতিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় চালানো ইসরাইলি গণহত্যার বিরুদ্ধে আমেরিকার অভ্যন্তরে যে ব্যাপক জনমত ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় ইসরাইলপন্থি অবস্থানে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিতে মার্কিন কংগ্রেসের সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক কৌশলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বাস্তবে এ ঘোষণার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে যতটা বড় বলে মনে হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত তা হয়তো ততটা সুদূরপ্রসারী হবে না।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান যে, ইসরাইলকে বছরে ৪০০ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়ার যে চুক্তি ছিল, তা এই বছরের শেষ নাগাদ কার্যকর থাকবে না। তবে তিনি এও যোগ করেন যে, ইসরাইলের বিশেষ প্রয়োজনে আমেরিকা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। সিএনএনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নির্বাচনের আগে নিজের দলের ভরাডুবির শঙ্কা থেকে নজর ঘোরাতে এবং ভোটারদের সমর্থন আদায়ে এটি তার একটি কৌশলগত অবস্থান হতে পারে। বিষয়টি শুধু মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নতুন প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেট ইসরাইলকে সহায়তার প্রশ্নে কী অবস্থান নেয়—তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

