কুমিল্লার বুড়িচংয়ের ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে পড়াশোনাকারী ২৬ বছর বয়সী ভারতীয় শিক্ষার্থী আদনান আলতাফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজের দুই দিন পর গত বুধবার কলেজের কাছের একটি পুকুর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আদনানের সহপাঠীরা যখন তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছিলেন, ঠিক সেই সময়ে তাঁর মৃত্যুর এই মর্মান্তিক খবরটি সামনে আসে। পরিবারের সদস্যরা তাঁর চিকিৎসাও করিয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা আর দেওয়া হলো না আদনানের। ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা ইতিমধ্যে অনেকেই ইন্টার্ন চিকিৎসক হয়েছেন। পরে মানসিক অসুস্থতা ও অন্য কারণে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করান।
বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফুর রহমান জানিয়েছেন, এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। বর্তমানে পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার তদন্ত চলছে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্তমানে আদনানের মরদেহ ঢাকার একটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরটি কার্যকর না থাকায় মরদেহ ঢাকায় পাঠানো হয়। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ভারতীয় হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে মরদেহটি ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে কর্মরত ভারতীয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (কনস্যুলার ও শিক্ষা) মৃন্ময় কুমার সিং ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনে আসেন।
তিনি কলেজের শিক্ষক, পরিচালক এবং এখানে অধ্যয়নরত ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পাশাপাশি কলেজের শিক্ষক ও পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
পরিদর্শনকালে তিনি আদনানের ব্যবহৃত ছাত্রাবাস, প্রতিদিন খাবার খেতে যাওয়া হোটেল এবং যে পুকুর থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই জায়গাগুলো ঘুরে দেখেন।
তিনি মূলত শিক্ষার্থীদের মনোবল বাড়ানো এবং বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির সার্বিক খোঁজখবর নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই সফর করেছেন।
ভারতীয় হাইকমিশনের এই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, এখানে এসে তাঁরা দেখেছেন যে কলেজ কর্তৃপক্ষ ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বেশ যত্নবান। তবে এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে বর্তমানে ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ প্রায় ২৭০ জন ভারতীয় শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন, যাদের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীর, আসাম, কেরালা, মহারাষ্ট্রসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থী রয়েছেন।
২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া আদনান আলতাফ পড়াশোনায় কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন। তাঁর মা নিঘাত বেগমের ভাষ্যমতে, আদনান মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং পরীক্ষার চাপ সামলাতে পারছিলেন না। নিঘাত বেগম ছেলের পাশে থাকতে কয়েকদিন আগে ভারত থেকে কুমিল্লায় এসেছিলেন। গত সোমবার রাতে বিসমিল্লাহ হোটেলে খাবার খেতে গিয়ে আদনান তাঁর মোবাইল ফোনটি সেখানে ফেলে আসেন। মায়ের পরামর্শে সেটি আনতে গিয়েই তিনি নিখোঁজ হন এবং আর ফিরে আসেননি।
কলেজ সূত্র জানায়, আদনান প্রথম পেশাগত পরীক্ষায় প্রথমবার পাস করলেও দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষায় তিনবারের চেষ্টায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষায় গত মে ও নভেম্বর মাসে অকৃতকার্য হন। এছাড়া করোনা মহামারির সময় অনলাইনে ক্লাস করলেও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করায় তিনি একাডেমিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়েন। কলেজের অধ্যক্ষ জাকিরুল ইসলামের মতে, পড়াশোনার চাপ থেকেই তিনি হতাশায় ভুগছিলেন। এর আগে আদনানের বাবা আলতাফ হোসাইন রাথারও ছেলের দেখাশোনার জন্য বেশ কয়েক মাস কুমিল্লায় অবস্থান করেছিলেন। তবে তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষায় ২০২৫ সালের মে মাসে অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। একই বছরের নভেম্বরের পরীক্ষাতেও অকৃতকার্য হন।

