খুলনার বড় বাজারের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ‘ইন্দ্রমোহন সুইটস’ দীর্ঘ শতকেরও বেশি সময় ধরে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেছে। ১৮৯০ সালে মানিকগঞ্জের ধূলসরা গ্রামের ইন্দ্রমোহন দে তৎকালীন সাহেবের বাজারের হেলাতলা রোডে একটি গোলপাতার ঘরে এই প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। সময়ের পরিক্রমায় সেই ঘরটি দ্বিতল দালানে রূপ নেয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ ১৮ বছর আইনি লড়াই শেষে ২০১৯ সালে দোকানটি বর্তমান ১৭ নম্বর হেলাতলা রোডের মসজিদ গলিতে স্থানান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ইন্দ্রমোহন দে টানা ৮২ বছর দোকানটি পরিচালনা করার পর ১৯৭২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
পাঁচ পদের ঐতিহ্য ও প্রস্তুতপ্রণালী
প্রতিষ্ঠাতার পর তাঁর ছেলে বেণীমাধব দে এবং পরবর্তীতে নাতি সঞ্জয় দে প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন। ২০১৯ সালে মালিকপক্ষ প্রবাসে স্থায়ী হলে দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে কারিগর হিসেবে কাজ করা কমলচন্দ্র সরকার এটি পরিচালনার দায়িত্ব নেন। কমলচন্দ্র সরকার জানান, ১৩৬ বছর আগে যে পাঁচ পদের মিষ্টি দিয়ে ব্যবসা শুরু হয়েছিল, আজও কেবল সেগুলোই বানানো হয়। পানতুয়া, রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ ও দানাদার—এই পাঁচ মিষ্টির রেসিপিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
স্বাদ ও পরিবেশনার শতবর্ষী রূপ
- স্থানীয় খামারের গরুর খাঁটি দুধের ছানা দিয়ে মিষ্টি তৈরি হয় এবং এতে কোনো আটা বা সুজি মেশানো হয় না।
- পানতুয়া ভাজা হয় খাঁটি ঘি দিয়ে, আর রসগোল্লা ও দানাদারের ভেতরে থাকে খাঁটি ক্ষীর।
- আজও ক্রেতাদের কলাপাতায় মুড়ে মিষ্টি দেওয়া হয় এবং ভেতরে বসে খাওয়ার সময় চামচের বদলে হাত ব্যবহারের নিয়ম চালু রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি ও গুণগত মান
অনন্য এই স্বাদের সুখ্যাতি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলারসহ বহু বিদেশি পর্যটক এই মিষ্টির প্রশংসা করেছেন। রবার্ট মিলার মুগ্ধ হয়ে কমল সরকারকে নিউইয়র্কে দোকান খোলার প্রস্তাব দিলেও ভালোবাসার টানে তিনি তা ফিরিয়ে দেন। গুণগত মানের বিষয়ে কমলচন্দ্র সরকার জানান, বিশুদ্ধ উপকরণ আর ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিই তাদের সুখ্যাতি দিয়েছে। ব্যবসা প্রসারের চেয়ে গুণগত মান ধরে রাখতেই তারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ মিষ্টি তৈরি করেন।

